ধর্ম

রবিউস সানি: আত্মশুদ্ধি, নেক আমল ও আল্লাহর পথে অব্যাহত যাত্রা

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

রবিউস সানি। হিজরি বর্ষপঞ্জির চতুর্থ মাস। অন্যান্য মাসের মতো এই মাসও আমাদের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া সময়েরই একটি অংশ। তবে কোনো একটি মাসকে ঘিরে আমাদের ইবাদত, আত্মশুদ্ধি কিংবা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়।

রমজান এলে আমরা কুরআন তিলাওয়াত বাড়াই, ইবাদতে মনোযোগী হই, দান-সদকা করি। বিশেষ কোনো উপলক্ষ এলে নেক আমলের প্রতি আমাদের আগ্রহও বেড়ে যায়। কিন্তু উপলক্ষ শেষ হয়ে গেলে অনেক সময় সেই আগ্রহও ধীরে ধীরে কমে যায়।

এখানেই রবিউস সানির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

আল্লাহর সঙ্গে একজন মুমিনের সম্পর্ক কোনো মৌসুমের সম্পর্ক নয়। এটি সারা জীবনের সম্পর্ক। ইবাদত কোনো বিশেষ মাসের জন্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি দিনের জন্য। তাওবা, সালাত, কুরআন, সদকা, মানুষের প্রতি দয়া ও উত্তম চরিত্রও কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকার বিষয় নয়।

প্রতিটি দিনই আমাদের সামনে নতুন সুযোগ নিয়ে আসে।

আর সেই সুযোগের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হলো সময়।

সময়: আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত

আমরা প্রায়ই অর্থ, সম্পদ, সুযোগ কিংবা সামর্থ্যকে জীবনের বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু এসব হারিয়ে গেলে অনেক কিছুই আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব। হারানো অর্থ পুনরায় উপার্জন করা যায়। হারানো সম্পদ আবার অর্জন করা যায়। কোনো সুযোগ কখনো কখনো আবারও ফিরে আসতে পারে।

কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরে আসে না।

প্রতিটি মাস পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের জীবনের শেষ গন্তব্যের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছি।

আল্লাহ বলেন,

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ করে, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে।”

সূরা আল-হাশর: ১৮

এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়। নিজের দিকে তাকাতে শেখায়। প্রশ্ন করতে শেখায়, যে সময় আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, আমরা আসলে সেটি কীভাবে ব্যয় করছি?

জীবনের কতটা সময় চলে গেছে, তার হিসাব আমরা জানি না। কিন্তু কতটা সময় বাকি আছে, সেটিও আমরা জানি না।

তাই রবিউস সানি হোক নিজের জীবনকে নতুন করে দেখার একটি উপলক্ষ।

নেক আমল কি শুধু বিশেষ সময়ের জন্য?

অনেক মানুষ রমজান কিংবা কোনো বিশেষ ধর্মীয় উপলক্ষে ইবাদতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই সময় শেষ হয়ে গেলে আগের অবস্থায় ফিরে যান।

অথচ একজন মুমিনের যাত্রা এমন হওয়ার কথা নয়।

রমজানে যদি আমরা বেশি কুরআন পড়ি, রমজানের পরও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে হবে।

যদি আমরা বেশি দান করি, দান অব্যাহত রাখতে হবে।

যদি আমরা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি, সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে।

যদি কোনো খারাপ অভ্যাস ছেড়ে দিই, আবার সেটিতে ফিরে যাওয়া উচিত নয়।

বিশেষ কোনো সময়ের ইবাদতের আসল সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা আমাদের জীবনে স্থায়ী অভ্যাস তৈরি করে।

নিজেকে তাই প্রতিদিন একটি প্রশ্ন করা যায়:

“গতকালের তুলনায় আজ আমি কি একটু ভালো?”

উন্নতি যত ছোটই হোক, তা মূল্যবান। শর্ত একটাই, সেটি হতে হবে আন্তরিক এবং ধারাবাহিক।

সালাত: আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন

একজন মুসলিমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।

সালাত কেবল নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করার একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

আল্লাহ বলেন,

“নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।”

সূরা আন-নিসা: ১০৩

আমাদের অনেকের সালাত হয়তো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কখনো এমনও হয়, শরীর সালাতে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মন অন্য কোথাও।

রবিউস সানি হতে পারে সালাতের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার নতুন করে দৃঢ় করার সময়।

যারা সালাতে অবহেলা করছেন, তারা আজ থেকেই ফিরে আসতে পারেন।

যাদের ফজরের সালাতে সমস্যা হয়, তারা ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারেন।

যারা সালাতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, তারা সালাতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে পারেন।

কারণ প্রতিটি সালাত আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি নতুন সুযোগ।

কুরআন: শুধু রমজানের জন্য নয়

কুরআন শুধু রমজানে পড়ার কিতাব নয়।

এটি আমাদের পুরো জীবনের জন্য হেদায়াতের গ্রন্থ।

আল্লাহ বলেন,

“নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয়, যা সর্বাধিক সঠিক।”

সূরা আল-ইসরা: ৯

তাই কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো একটি মাসে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

প্রতিদিন কয়েকটি আয়াত হলেও পড়া যায়।

কিন্তু শুধু কত পৃষ্ঠা পড়লাম, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতটা বুঝলাম এবং কতটা জীবনে প্রয়োগ করলাম।

পড়ুন।

চিন্তা করুন।

শিখুন।

তারপর নিজের জীবনে প্রয়োগ করুন।

একটি আয়াত যদি সত্যিকার অর্থে আমাদের আচরণ পরিবর্তন করে, তবে সেটি শুধু অনেক পৃষ্ঠা পড়ে যাওয়ার চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে।

তাওবা: ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা

মানুষ ভুল করবে, এটাই মানুষের স্বাভাবিক বাস্তবতা।

আমরা সবাই ভুল করি।

কখনো মানুষকে কষ্ট দিই।

কখনো ইবাদতে অবহেলা করি।

কখনো এমন কিছু করি, যার কথা আমরা ছাড়া আর কেউ জানে না।

কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা হলো, তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি।

আল্লাহ বলেন,

“হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

সূরা আয-যুমার: ৫৩

অতীতের ভুল আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে বাধ্য নয়।

সালাত ছেড়ে দিলে আবার শুরু করুন।

কাউকে কষ্ট দিলে ক্ষমা চান।

আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে গেলে আবার ফিরে আসুন।

হৃদয় যদি আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে চলে যায়, তবে রবিউস সানি হতে পারে ফিরে আসার একটি উপলক্ষ।

আজকের একটি আন্তরিক তাওবা হয়তো আগামী দিনের পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে।

সদকা: আল্লাহর দেওয়া থেকে অন্যকে দেওয়া

আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, তার কিছু অংশ অন্যের কল্যাণে ব্যয় করা বড় নেক আমল।

আল্লাহ বলেন,

“তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণ অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।”

সূরা আল-মুযযাম্মিল: ২০

সদকা মানেই শুধু টাকা দেওয়া নয়।

এক বেলার খাবারও সদকা হতে পারে।

কাউকে পোশাক দেওয়া সদকা হতে পারে।

কোনো অসহায় মানুষের প্রয়োজন মেটানো সদকা হতে পারে।

কারও শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়া সদকা হতে পারে।

এতিমের পাশে দাঁড়ানো সদকা হতে পারে।

কারও জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা সদকা হতে পারে।

এমনকি একটি ভালো কথাও সদকা হতে পারে।

তাই সদকার ক্ষেত্রে অঙ্কের চেয়ে নিয়ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা কতটা দিলাম, সেটিই সব নয়।

কেন দিলাম, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

দরিদ্র ও অসহায়দের কথা ভুলে গেলে চলবে না

আমাদের চারপাশে এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যারা প্রতিদিন মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য সংগ্রাম করছেন।

কোনো পরিবার জানে না, পরবর্তী খাবারটি কোথা থেকে আসবে।

কোনো বাবা-মা সন্তানের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না।

কেউ পর্যাপ্ত বাসস্থানের অভাবে আছেন।

কেউ প্রয়োজনীয় পোশাক কিনতে পারছেন না।

কোনো বয়স্ক মানুষ পর্যাপ্ত সহায়তা ছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন।

কোনো বিধবা একাই সন্তানদের বড় করছেন।

কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আর্থিক ও সামাজিক সমস্যার সঙ্গেও লড়ছেন।

কোনো এতিম শিশু প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তা ছাড়াই বড় হচ্ছে।

এসব মানুষের প্রয়োজন কোনো বিশেষ মাস শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।

তাদের প্রয়োজন সারা বছর থাকে।

তাই আমাদের দয়া, সহমর্মিতা এবং সহযোগিতাও সারা বছর অব্যাহত থাকা উচিত।

এতিমের দায়িত্ব নেওয়া

ইসলাম এতিমদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“আমি এবং যে ব্যক্তি কোনো এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করে, জান্নাতে এভাবে থাকব।”

এ কথা বলার সময় তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন।

সহিহ বুখারি

একজন এতিমকে সহযোগিতা করার অনেক পথ রয়েছে।

খাবার দেওয়া যায়।

পোশাক দেওয়া যায়।

শিক্ষার খরচে সহযোগিতা করা যায়।

চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।

এতিমখানা বা মাদরাসাকে সহায়তা করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি শিশুকে এমন অনুভূতি দেওয়া যে, সমাজ তাকে ভুলে যায়নি।

একটি ছোট্ট দয়ার কাজও একটি শিশুর মনে বহু বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে।

বিধবা ও সংকটে থাকা পরিবারের পাশে

একজন বিধবার ওপর অনেক সময় পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে। বিশেষ করে সন্তানদের দেখাশোনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বিধবা ও দরিদ্র মানুষের সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন,

“যে ব্যক্তি বিধবা ও দরিদ্রের সাহায্যে চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীর মতো।”

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

এ থেকে বোঝা যায়, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো কোনো ছোট কাজ নয়।

কোনো পরিবার পুরোপুরি বিপর্যস্ত হওয়ার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

অনেক সময় শুরুতেই সামান্য সহযোগিতা একটি ছোট সমস্যাকে বড় সংকটে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

প্রতিবন্ধী মানুষের মর্যাদা

প্রতিবন্ধী মানুষ এমন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, যা অন্যরা সবসময় বুঝতে পারেন না।

কারও চলাফেরায় সমস্যা রয়েছে।

কারও নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন।

কারও বিশেষ সরঞ্জাম প্রয়োজন।

কারও শিক্ষা বা কর্মসংস্থানে সমস্যা হচ্ছে।

কারও দৈনন্দিন কাজেও সহযোগিতা প্রয়োজন।

ইসলাম প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা স্বীকার করতে শিক্ষা দেয়।

তাই প্রতিবন্ধী মানুষকে সহায়তা করাকে শুধু দান হিসেবে দেখা উচিত নয়।

এটি সহমর্মিতা।

এটি সম্মান।

এটি সামাজিক দায়িত্ব।

আমাদের এমন সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষ উপেক্ষিত নয়, বরং সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।

মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পাশে

উপকারী জ্ঞান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

অনেক মাদরাসার শিক্ষার্থী সীমিত সামর্থ্যের পরিবার থেকে আসে।

খাবার, পোশাক, বই এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য কেউ কেউ দানের ওপর নির্ভরশীল।

তাদের শিক্ষায় সহযোগিতা করলে তারা নিজেদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও বহু মানুষের উপকার করতে পারে।

সহযোগিতা করা যায়:

কুরআন ও হাদিসের বই দিয়ে।

শিক্ষাসামগ্রী দিয়ে।

পোশাক দিয়ে।

আবাসনের ব্যবস্থা করে।

চিকিৎসার খরচ দিয়ে।

মাদরাসার প্রয়োজনীয় সুবিধা তৈরিতে।

বৃত্তি ও শিক্ষার খরচে।

আজকের একটি সহযোগিতা হয়তো এমন একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, যে আগামী দিনে বহু মানুষের জন্য উপকারী হয়ে উঠবে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথাও মনে রাখতে হবে

শিক্ষার সহযোগিতা শুধু মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

দরিদ্র ও সংগ্রামী পরিবারের বহু সাধারণ শিক্ষার্থীও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।

কেউ টিউশন ফি দিতে পারছে না।

কেউ পরীক্ষার ফি দিতে পারছে না।

কেউ পরিবহন খরচ দিতে পারছে না।

কেউ প্রয়োজনীয় বই বা শিক্ষাসামগ্রী কিনতে পারছে না।

একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যেন শুধু অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়।

অনেক সময় সামান্য সহযোগিতাই একজন শিক্ষার্থীকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।

কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর সদকা হলো এমন সাহায্য, যা একজন মানুষকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়।

ছোট আমলকে ছোট ভাববেন না

অনেক সময় আমরা মনে করি, বড় কোনো কাজ করার সামর্থ্য না থাকলে আমাদের দ্বারা বড় কোনো ভালো কাজ সম্ভব নয়।

কিন্তু আল্লাহ আন্তরিকতা দেখেন।

রাসুলুল্লাহ ﷺ ছোট ছোট ভালো কাজের গুরুত্বের কথাও বলেছেন।

একটি হাসি সদকা হতে পারে।

কাউকে সাহায্য করা সদকা হতে পারে।

কাউকে সামান্য কিছু দেওয়া সদকা হতে পারে।

অসুস্থ মানুষের খোঁজ নেওয়া সদকা হতে পারে।

কারও বোঝা বহনে সহযোগিতা করা সদকা হতে পারে।

তাই কোনো ভালো কাজকে ছোট মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়।

আমরা জানি না, কোন আমলটি আল্লাহ কবুল করবেন এবং কোন আমলকে তিনি আমাদের জন্য বিপুল কল্যাণের মাধ্যম বানিয়ে দেবেন।

উত্তম চরিত্রও ইবাদত

ইবাদত শুধু মসজিদের ভেতরের কিছু কাজের নাম নয়।

আমাদের চরিত্রও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমাদের আরও ধৈর্যশীল হতে হবে।

আরও দয়ালু হতে হবে।

আরও সৎ হতে হবে।

আরও বিশ্বস্ত হতে হবে।

আরও নম্র হতে হবে।

আরও উদার হতে হবে।

আরও সম্মানজনক আচরণ করতে হবে।

আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে।

একজন মানুষ নিয়মিত সালাত আদায় করলেও অন্যদের সঙ্গে তার আচরণ কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের কথাবার্তা কেমন?

আমরা মানুষের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করি?

ব্যবসা ও কর্মক্ষেত্রে আমাদের লেনদেন কেমন?

অন্যের অধিকার নিয়ে আমরা কতটা সচেতন?

এসবও আমাদের দ্বীনের অংশ।

ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়।

আমাদের আচরণেও ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ পাওয়ার কথা।

ক্ষমা করার শক্তি

সবচেয়ে কঠিন ভালো কাজগুলোর একটি হলো ক্ষমা করা।

কখনো মানুষ আমাদের গভীরভাবে কষ্ট দেয়।

কখনো আমরা বছরের পর বছর সেই কষ্ট ও রাগ ধরে রাখি।

কিন্তু দীর্ঘদিনের ক্রোধ শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের হৃদয়েরই ক্ষতি করতে পারে।

আল্লাহ বলেন,

“যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”

সূরা আলে ইমরান: ১৩৪

ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে, অন্যায়কে মেনে নিতে হবে কিংবা কাউকে আবারও আমাদের ক্ষতি করার সুযোগ দিতে হবে।

বরং এর অর্থ হলো, নিজের হৃদয়কে ক্রোধের বন্দি না করা।

প্রয়োজনে ন্যায়বিচার চাইতে হবে, নিজের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হৃদয়কে ক্ষমার জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা

আমরা অনেক সময় যা পেয়েছি, তা ভুলে যাই। বরং যা পাইনি, তা নিয়েই বেশি ভাবি।

অথচ আমাদের জীবনে এমন অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে, যেগুলো আমরা প্রতিদিন স্বাভাবিক বলে ধরে নিই।

একটি সুস্থ শরীর।

একটি নিরাপদ ঘর।

খাবার।

পরিষ্কার পানি।

পরিবার।

শিক্ষা।

বন্ধু।

হাঁটার সামর্থ্য।

শোনার সামর্থ্য।

কথা বলার সামর্থ্য।

আল্লাহর ইবাদত করার সামর্থ্য।

প্রতিটিই একটি নিয়ামত।

আল্লাহ বলেন,

“তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।”

সূরা ইবরাহিম: ৭

তবে কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথায় প্রকাশ পায় না।

আল্লাহ যদি সম্পদ দিয়ে থাকেন, তার কিছু অংশ অন্যদের সাহায্যে ব্যয় করুন।

জ্ঞান দিয়ে থাকলে অন্যকে শেখান।

শক্তি দিয়ে থাকলে দুর্বলদের সাহায্য করুন।

সময় দিয়ে থাকলে অন্যের জন্য সময় দিন।

নিয়ামতের প্রকৃত কৃতজ্ঞতা হলো সেই নিয়ামতকে কল্যাণের কাজে ব্যবহার করা।

রবিউস সানি ও আখিরাতের প্রস্তুতি

প্রতিটি মাস আমাদের জীবনের শেষ গন্তব্যের দিকে আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহ বলেন,

“প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”

সূরা আলে ইমরান: ১৮৫

এ বাস্তবতা থেকে কেউ পালাতে পারবে না।

আমাদের সম্পদ থেকে যাবে।

আমাদের পেশা থেকে যাবে।

আমাদের সম্পত্তি থেকে যাবে।

কিন্তু আমাদের আমল আমাদের সঙ্গে যাবে।

তাই জীবনের হিসাব শুধু এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়,

“আমি কী অর্জন করেছি?”

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত,

“আমি আমার আখিরাতের জন্য কী পাঠিয়েছি?”

একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া।

একজন এতিমের যত্ন নেওয়া।

একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করা।

কাউকে কুরআন শেখানো।

একজন অসুস্থ মানুষের খোঁজ নেওয়া।

কারও প্রয়োজন পূরণ করা।

কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া।

অন্যদের উপকারে আসে এমন জ্ঞান শেখানো।

এসবই আখিরাতের জন্য স্থায়ী বিনিয়োগ হয়ে থাকতে পারে।

পরিবর্তনের জন্য রমজানের অপেক্ষা কেন?

আমরা অনেক সময় মনে করি, বড় কোনো পরিবর্তন শুরু করতে হলে রমজান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু কেন?

ভালো কাজ শুরু করার জন্য বিশেষ কোনো মাসের প্রয়োজন নেই।

দান করার জন্য ধনী হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে না।

কুরআন পড়ার জন্য রমজানের অপেক্ষা করতে হবে না।

তাওবা করার জন্য কোনো বিশেষ দিন প্রয়োজন নেই।

আমরা আজ থেকেই শুরু করতে পারি।

এক ওয়াক্ত সালাত দিয়ে।

এক পৃষ্ঠা কুরআন দিয়ে।

একটি সদকা দিয়ে।

একটি ক্ষমা দিয়ে।

একটি ভালো কাজ দিয়ে।

একজন মানুষকে সাহায্য করার মাধ্যমে।

একটি গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখার মাধ্যমে।

একটি আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে।

তারপর সেই ছোট কাজটিই অব্যাহত রাখুন।

কারণ জীবনের বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট কিন্তু ধারাবাহিক পদক্ষেপ থেকেই শুরু হয়।

যারা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন

হয়তো এই লেখা পড়ছেন এমন কেউ এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

হয়তো আর্থিক সংকট চলছে।

হয়তো পরিবারে সমস্যা রয়েছে।

হয়তো নিজের কোনো ভুলের জন্য গভীর অনুশোচনায় আছেন।

হয়তো মনে হচ্ছে, আপনার দোয়ার কোনো উত্তর আসছে না।

তবু আশা হারাবেন না।

যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, তিনি আপনার পরিস্থিতিও পরিবর্তন করতে সক্ষম।

সালাত অব্যাহত রাখুন।

দোয়া অব্যাহত রাখুন।

চেষ্টা অব্যাহত রাখুন।

নেক আমল অব্যাহত রাখুন।

আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।

কষ্টের অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ আপনাকে ছেড়ে দিয়েছেন।

কখনো কখনো কঠিন সময়ই মানুষকে তার রবের আরও কাছে নিয়ে আসে।

একে অপরের প্রতি আমাদের দায়িত্ব

আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

কিন্তু আমরা একে অপরের সমস্যাকে কিছুটা সহজ করতে পারি।

কেউ ক্ষুধার্ত হলে তাকে খাবার দিন।

কেউ তৃষ্ণার্ত হলে তাকে পানি দিন।

কেউ দরিদ্র হলে তাকে সাহায্য করুন।

কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজ নিন।

কেউ শোকাহত হলে তাকে সান্ত্বনা দিন।

কেউ শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করলে তাকে সহযোগিতা করুন।

কেউ এতিম হলে তার যত্ন নিন।

কেউ বিধবা হলে তার পাশে দাঁড়ান।

কেউ প্রতিবন্ধী ও সহায়তার প্রয়োজন হলে তাকে সহযোগিতা করুন।

কেউ আশা হারিয়ে ফেললে তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিন।

এভাবেই একটি সমাজ গড়ে ওঠে।

সবাই সমান সম্পদের অধিকারী বলে নয়, বরং যাদের বেশি আছে তারা যাদের কম আছে তাদের পাশে দাঁড়ায় বলেই একটি সমাজ মানবিক হয়ে ওঠে।

রবিউস সানি হোক নতুন অঙ্গীকারের মাস

রবিউস সানির জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত নেই, যা শুধু এই মাসেই পালন করতে হবে।

বরং প্রতিটি মাসই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

আমাদের জীবন দ্রুত চলে যাচ্ছে।

তাই সময় চলে যাওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই নেক আমল শুরু করা উচিত।

সালাতের প্রতি আরও যত্নবান হই।

কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করি।

তাওবা করি।

দোয়া করি।

নিজেদের চরিত্র সংশোধন করি।

দরিদ্র ও অসহায়দের পাশে দাঁড়াই।

এতিমদের সহায়তা করি।

বিধবাদের সহযোগিতা করি।

প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়াই।

মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করি।

আর্থিক সংকটে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা করি।

নিজেদের সম্পদ, জ্ঞান, সময় ও সামর্থ্য অন্যের কল্যাণে ব্যবহার করি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা যেন উপলব্ধি করি যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি নিয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে।

খাদ্য তাঁর পক্ষ থেকে।

স্বাস্থ্য তাঁর পক্ষ থেকে।

সম্পদ তাঁর পক্ষ থেকে।

জ্ঞান তাঁর পক্ষ থেকে।

সুযোগ তাঁর পক্ষ থেকে।

এমনকি আমাদের প্রতিটি শ্বাসও তাঁর দেওয়া নিয়ামত।

শেষ কথা

রবিউস সানি শুধু হিজরি বর্ষের আরেকটি মাস নয়।

এটি আমাদের জন্য একটি থামার সুযোগ।

নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ।

সময়কে নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ।

আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ।

ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ।

নেক আমলকে ধারাবাহিক করার সুযোগ।

অন্য মানুষের জীবনে কল্যাণের কারণ হওয়ার সুযোগ।

আমরা যেন রবিউস সানিকে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি মাস হিসেবে পার করে না দিই।

বরং এটিকে বানাই আত্মশুদ্ধির মাস।

তাওবার মাস।

কৃতজ্ঞতার মাস।

নতুন অঙ্গীকারের মাস।

আল্লাহর আরও নৈকট্য অর্জনের মাস।

এবং তাঁর সৃষ্টির জন্য আরও বেশি উপকারী হয়ে ওঠার মাস।

আল্লাহ আমাদের সালাত কবুল করুন।

আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন।

আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী করুন।

আমাদের পরিবার, দরিদ্র, অসহায় ও এতিমদের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দিন।

বিধবা ও অভাবীদের সহযোগিতা করার সামর্থ্য দিন।

প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়ার তাওফিক দিন।

শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দিন।

আমাদের সমাজের প্রয়োজনীয় মানুষের জন্য দয়া ও কল্যাণের মাধ্যম বানিয়ে দিন।

আমাদের নেক আমল, উপকারী জ্ঞান, হালাল রিজিক এবং ঈমানের ওপর সুন্দর পরিণতি দান করুন।

আমিন।

নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply