সারাদেশ

মাদকের বিরুদ্ধে কসবা থানার সফল অভিযান: ১৪ কেজি গাঁজাসহ তিন কারবারি গ্রেফতার

সীমান্তপথে মাদক চোরাচালান রুখতে কসবা থানার ধারাবাহিক অভিযান; জিরো টলারেন্স নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের প্রত্যাশা স্থানীয়দের

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা সীমান্তবর্তী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কারবারিদের অন্যতম রুট হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মাদক কারবারিরা বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)-এর কঠোর নজরদারি এড়িয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। তবে বিজিবির পাশাপাশি কসবা থানা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানেও একের পর এক মাদকের চালান জব্দ হচ্ছে এবং গ্রেফতার হচ্ছে মাদক কারবারিরা। সরকারের ঘোষিত মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে কসবা থানা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে স্থানীয়দের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আলী মো. রাশেদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদকবিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে অতীতে একই দিনে একই গাড়ি থেকে প্রায় ৩৬০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে কসবা থানা পুলিশ ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপর থেকে মাদক নির্মূলে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছে থানা পুলিশ।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার দিবাগত রাত প্রায় ১১টা ৩০ মিনিটে কসবা থানার একটি চৌকস দল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ১৪ (চৌদ্দ) কেজি গাঁজা, মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি অটোরিকশাসহ তিনজন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন এসআই (নিরস্ত্র) মো. মিনহাজুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এএসআই (নিরস্ত্র) সঞ্জয় কুমার সাহা এবং সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যরা। অভিযানটি পরিচালিত হয় কসবা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের শাহপুর দক্ষিণ-পূর্ব পাড়া কবরস্থানের প্রায় ১০০ গজ পশ্চিমে দুলাল মিয়ার বাড়ির সামনে পাকা সড়কে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— ইসমাইল (৩২), পিতা: মৃত আলী হোসেন, মাতা: আছিয়া বেগম, সাং-আকবপুর, কসবা পৌরসভা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া; মো. ইকবাল (২৭), পিতা: ধনু মিয়া, মাতা: রাজিয়া বেগম এবং মো. মাহফুজ মিয়া (২৮), পিতা: নূর মোহাম্মদ, মাতা: জাহানা বেগম। ইকবাল ও মাহফুজ উভয়ের বাড়ি কুইয়াপানিয়া, ৬ নম্বর গোপীনাথপুর ইউনিয়ন, উপজেলা কসবা, জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতদের হেফাজত থেকে মোট ১৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে এবং মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত অটোরিকশাটি জব্দ করা হয়েছে।
কসবা থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ ঘটনায় এফআইআর নং-৪১, তারিখ: ২৪ জুলাই ২০২৬; জি.আর. নং-৩১৩, তারিখ: ২৪ জুলাই ২০২৬; মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণির ১৯(খ)/৩৮/৪১ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
অভিযানের পর স্থানীয় বাসিন্দারা কসবা থানা পুলিশের এমন ধারাবাহিক মাদকবিরোধী অভিযানের প্রশংসা করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, “সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে মাদক প্রবেশের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের কঠোর অভিযানে মাদক কারবারিরা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আমরা চাই এই অভিযান আরও জোরদার হোক এবং মাদকমুক্ত কসবা গড়ে উঠুক।”
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “মাদক একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ অভিশাপ। পুলিশের এমন ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকলে তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মাদক পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবসা একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। তারা বলেন, শুধু গ্রেফতার করাই নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মাদক অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি, যা ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—তিনটিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগই একটি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারের ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় কসবা থানা পুলিশের চলমান মাদকবিরোধী অভিযান ভবিষ্যতেও একই কঠোরতায় অব্যাহত থাকবে এবং সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণরূপে নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply