সারাদেশ

ধর্ষকদের দৌরাত্ম্য থামছেই না—রাষ্ট্র কি শুধু বিবৃতি দিতেই সীমাবদ্ধ?

আইন আছে, শাস্তিও আছে—তবুও কেন থামছে না ধর্ষণ? বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় প্রশ্নবিদ্ধ নিরাপত্তা ব্যবস্থা

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়—এটি এক ভয়াবহ ও নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন একটি নাম, নতুন একটি ‘আতিকা’—আর প্রতিবারই একই প্রশ্ন: আমরা আর কত মৃত্যু দেখব, আর কত লজ্জার পরও নীরব থাকব?
রাষ্ট্রের বইয়ে কঠোর আইন আছে—নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এবং দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারা। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারিত। কিন্তু বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় শাস্তি যেন ভোগ করছে ভুক্তভোগীরা—আর সবচেয়ে বড় সুবিধা পাচ্ছে অপরাধীরা।
প্রশ্নটা এখন আর আইন আছে কি নেই—তা নয়; প্রশ্ন হলো আইন কেন কার্যকর হচ্ছে না?
কেন মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে? কেন তদন্তের গতি থেমে যায়? কেন সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিচার শেষ হয় না? আর কেনই বা অপরাধীরা বারবার মনে করে—“আমার কিছুই হবে না”?
এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আজ অপরাধের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। আইন থাকলেও তার প্রয়োগে শৈথিল্য, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতা।
সমাজের বাস্তবতাও কম দায়ী নয়। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনও গভীর বৈষম্য বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়—পোশাক, চলাফেরা, বা ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে। এই মানসিকতা শুধু অমানবিক নয়, এটি সরাসরি অপরাধের পক্ষেই নীরব সমর্থন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, মাদকাসক্তি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার অপরাধ বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধের সংকট আজ স্পষ্ট।
অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা পরিচিত বা প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের বদলে পায় ভয়, চাপ এবং দীর্ঘ অপেক্ষা—যা শেষ পর্যন্ত অনেককে বিচার চাওয়ার পথ থেকেও সরিয়ে দেয়।
এ অবস্থায় প্রশ্ন আরও তীব্র হয়—রাষ্ট্র কি সত্যিই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?
শুধু আইন তৈরি নয়, এখন প্রয়োজন তার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান প্রয়োগ। বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে, তদন্তকে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে, এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে।
একই সঙ্গে সমাজকে বদলাতে হবে ভেতর থেকে—স্কুল, পরিবার ও গণমাধ্যমকে নিতে হবে দায়িত্ব। নারীর প্রতি সম্মান কোনো স্লোগান নয়—এটি হতে হবে দৈনন্দিন চর্চা।
আজ যদি ব্যবস্থা না বদলায়, তবে আগামীকাল আরও একটি ‘আতিকা’ জন্ম নেবে—আর আমরা আবারও একই প্রশ্ন লিখব, একই নীরবতা বহন করব।
প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি শুধু শোকবার্তা দিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?

Leave a Reply