প্রশাসনের অভিযান চললেও প্রভাবশালীদের তদবির ও পুনরায় ড্রেজার চালুর অভিযোগ; পরিবেশবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয়দের দাবি—সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না করলে কৃষিজমি রক্ষা অসম্ভব
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের একাধিক অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও এখনো বন্ধ হয়নি অবৈধ ড্রেজারের দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে, অভিযান শেষে জেল-জরিমানা দেওয়ার পরও মাত্র এক-দুই দিনের ব্যবধানে আবারও চালু হয়ে যাচ্ছে ড্রেজার। এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে উর্বর ফসলি জমি, অন্যদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার শিকারপুর-বাদৈর ইউনিয়ন এবং নিমতাবাদ বিনাটি ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া এলাকায় গিয়ে একাধিক স্থানে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে মাটি উত্তোলনের দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানের পর কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে আবার আগের মতোই ড্রেজার চালু হয়ে যায়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায় লাভের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকা জরিমানা দিয়েও ব্যবসায়ীরা পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে। তাদের ভাষ্য, “একদিন জরিমানা হয়, পরের দিনই আবার ড্রেজার চলে। এতে অভিযানের কোনো স্থায়ী সুফল মিলছে না।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অবৈধভাবে মাটি কাটার কারণে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, অনেক জায়গায় জমি গভীর গর্তে পরিণত হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ ড্রেজার ব্যবসার পেছনে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া রয়েছে। ফলে প্রশাসন অভিযান চালালেও বিভিন্ন সময় তদবির ও চাপের মুখে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহ আগে সামবাড়ী এলাকায় অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) কসবার সঙ্গে জাহাঙ্গীর মোল্লা নামে এক ব্যক্তি অশোভন আচরণ করেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে তাকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে তদবির চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রেজারের মাধ্যমে নির্বিচারে মাটি উত্তোলনের ফলে কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়ে। তারা বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণে আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো অপরাধ বারবার সংঘটিত হয়, তখন শুধু অভিযান পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; অপরাধের মূল কারণ ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা কঠিন হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, কৃষিজমি ধ্বংস হওয়া শুধু পরিবেশগত ক্ষতিই নয়, এটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই অবৈধ ড্রেজার ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতায় এ ধরনের অপরাধে অধিক জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়ার আইনগত সুযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম শাস্তি দেওয়ায় অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে না। ফলে তারা বারবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমন্বিতভাবে কাজ করলে অবৈধ ড্রেজার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব হবে। অন্যথায় ফসলি জমি রক্ষা করা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কেবল নিয়মিত অভিযান নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং যারা এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার বা তদবির করেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাহলেই কসবার কৃষিজমি, পরিবেশ ও জনস্বার্থ কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।






