কসবা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেও অনিশ্চয়তায় অসহায় রোগীরা; আবেদন বাতিল নিয়ে উপজেলা ও জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বক্তব্যে ভিন্নতা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ক্যান্সারসহ সরকার নির্ধারিত সাতটি জটিল রোগে আক্রান্ত অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। আবেদন করেও মাসের পর মাস সহায়তা না পাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন কাটছে রোগী ও তাঁদের পরিবারের। এমনই এক ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ ঘিরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কসবা উপজেলার কুটি ইউনিয়নের বাসিন্দা জজু মিয়ার স্ত্রী হেলেনা বেগমের শ্বাসনালিতে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে। নিজেদের সর্বস্ব ব্যয় করে কোনোভাবে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে গত ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে সরকারি আর্থিক সহায়তার আশায় কসবা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেন হেলেনা বেগম। কিন্তু প্রায় ১০ মাস পার হলেও এখনো তাঁর হাতে পৌঁছায়নি সরকারি সহায়তার টাকা।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, আবেদন করার পর বারবার নতুন কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে একাধিকবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়েও যেতে হয়েছে। এতকিছুর পরও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সহায়তা।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, আবেদনটি কসবা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কসবা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আলমগীর মিয়া জানান, আবেদনটি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে বাতিল করা হয়েছে।
আবেদন বাতিলের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর কার্যালয়ে বছরে প্রায় ১০০ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বরাদ্দ রয়েছে। অথচ আবেদন জমা পড়ে ৫০০ থেকে ৬০০টি। ফলে সবাইকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না।
তবে এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বক্তব্য ভিন্ন। তিনি জানান, সার্ভারের ত্রুটির কারণে এসব আবেদন পুনরায় উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে করার জন্য জানানো হয়েছে।
দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে এমন ভিন্নতা তৈরি হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারটির মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আবেদনটি প্রকৃতপক্ষে কেন বাতিল হয়েছে, নাকি সার্ভার জটিলতার কারণে পুনরায় আবেদনের প্রয়োজন—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আবেদনকারীর অভিযোগ, ক্যান্সারসহ জটিল রোগের চিকিৎসা সহায়তার জন্য আবেদন করেও তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন। কখনো কাগজপত্রের জটিলতা, কখনো অনলাইন সমস্যার কথা বলে তাঁদের বারবার সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। অথচ অসুস্থ রোগীদের অনেকেরই নিয়মিত চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই।
সমাজসেবা ও মানবিক সহায়তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত জীবনের কঠিন সময়ে সরকারি সহায়তার আবেদন করেন। এসব আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। কোনো আবেদন বাতিল হলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ আবেদনকারীকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, অসহায় রোগীরা যখন চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে নিজেদের সর্বস্ব হারাচ্ছেন, তখন সরকারি সহায়তা পেতে তাঁদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে কেন? সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যদি আবেদন নিষ্পত্তিতেই এত দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, তাহলে সংকটাপন্ন রোগীরা প্রকৃত সময়ে কীভাবে উপকৃত হবেন?
ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন মহল কসবা উপজেলা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমাজসেবা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনটির প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ, বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান এবং যোগ্য রোগীদের দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।
মানবিক প্রশ্ন একটাই—ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা যদি সময়মতো না পৌঁছায়, তাহলে সেই সহায়তার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা কোথায়? রোগীর হাতে সহায়তা পৌঁছাতে দেরি হলে অনেক সময় সেই অর্থ পাওয়ার আগেই চিকিৎসার সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভুক্তভোগীদের আকুল আবেদন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নয়, অসহায় রোগীদের জীবন বাঁচানোই হোক অগ্রাধিকার।






