Topজাতীয়

শূন্য হচ্ছে রাষ্ট্রপতির পদ এগিয়ে মির্জা ফখরুল

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করছেন—এমন আলোচনা এখন তুঙ্গে। আজ শুক্রবারই তিনি পদত্যাগ করতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে। এমন আলোচনার মধ্যেই জানা গেছে, বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ শুক্রবারই দেশে ফিরছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ফলে এতে অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজই পদত্যাগ করবেন এবং এ কারণেই স্পিকার বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে আজই দেশে ফিরছেন। এদিকে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন—এমন খবর জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে আলোচনা জোরালো হচ্ছে যে, কে হতে যাচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি? এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির চার শীর্ষ ও প্রবীণ নেতা। তারা হলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সার্বিক সমীকরণে দল ও দলের বাইরে পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম, যিনি বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে নতুন রাষ্ট্রপতি যিনিই হন না কেন, তাকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাই সরকার, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্ব পাচ্ছে।

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। এরই মধ্যে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের জন্য বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফলে শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি শিগগির পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন এমন আলোচনা বেশ জোরালো হয়েছে। রাষ্ট্রপতি তার অধস্তন কর্মীদের শিগগির বঙ্গভবন ছেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকবেন অথবা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেন। এদিকে, মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলে কথাবার্তা চলছে। এক্ষেত্রে বিএনপির ওই চার নেতা ছাড়াও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নামও আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা—এসব বিবেচনা থেকে তার নাম সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সংবিধানে কী আছে: সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা।

নতুন রাষ্ট্রপতির আলোচনায় বিএনপির ৪ নেতা: জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার আলোচনায় আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাদের মধ্যে ১৯৪৬ সালে ১ অক্টোবর কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব অনুষদে জুনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। পর্যায়ক্রমে সহকারী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূ-তত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৭৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ভূতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। ১৯৭৪ সালে ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিআইসি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি ১৯৭১ সালে প্রবাসীদের সংগঠিত করেন এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন।

১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি কুমিল্লা (উত্তর) জেলা বিএনপির সভাপতি এবং বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও যুগ্ম মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৪ সাল থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। কুমিল্লা-২ আসন থেকে চারবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা থাকায় অনেক মিথ্যা মামলায় বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। তার আবদুল মোমেন খান বাংলাদেশের প্রাক্তন সর্বোচ্চ বেসামরিক কর্মকর্তা (মন্ত্রিসভা সচিব) এবং বিএনপির একজন প্রাক্তন রাজনীতিবিদ। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। ড. মঈন খান বিএনপির বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো নরসিংদী-২ আসন (পলাশ) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ১৯৯৩-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, ২০০১-২০০২ সাল পর্যন্ত তথ্যমন্ত্রী এবং ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (বর্তমানে নাম পরিবর্তিত) মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে সক্রিয় থাকায় তাকে মিথ্যা মামলায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, কারাবরণও করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান ১৯৭০-এর দশকে শ্রমিক আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান মেশিন টুলস কারখানার (বর্তমান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি) শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৭১ সালের মার্চে গাজীপুরের জয়দেবপুরে সর্বদলীয় মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তিনি কুয়েতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সে সময় বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নজরুল ইসলাম

নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply