বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, সংঘাতময় ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত দৈনিক আমাদের সমাচার পরিবারসহ দেশবাসী। এই প্রস্থান শুধু একজন নেত্রীর নয়—এটি একটি রাজনৈতিক যুগের বিদায়।
শৈশব: রাজনীতির বাইরে বেড়ে ওঠা এক কিশোরী
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে একেবারেই অরাজনৈতিক পরিবেশে। শান্ত, সংযত ও আত্মমর্যাদাবোধে গড়া এই শৈশবেই তৈরি হয় তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ় ভিত। রাজনীতির আলো তখনও তাঁর জীবনে পড়েনি—বরং পরিবার ও শিক্ষাই ছিল তাঁর জগত।
বিবাহ ও আকস্মিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান-এর সঙ্গে বিবাহের পর তাঁর জীবন নতুন বাঁকে মোড় নেয়। ১৯৭৫–পরবর্তী অস্থির সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এলে খালেদা জিয়া হন রাষ্ট্রপ্রধানের সহধর্মিণী। তবে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর, ব্যক্তিগত শোকই তাঁকে ধীরে ধীরে রাজনীতির মঞ্চে টেনে আনে—এটি ছিল কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং পরিস্থিতির চাপ থেকে জন্ম নেওয়া দায়িত্ব।
রাজনীতিতে উত্থান: প্রতিরোধের প্রতীক
১৯৮০–এর দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন একজন দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। ১৯৯১ সালে তিনি দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে সমর্থন ও সমালোচনার সমান মুখে দাঁড় করায়।
প্রধানমন্ত্রীত্বের পর ঘাত–প্রতিঘাত
ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর জীবনে আসে কঠিন সময়। রাজনৈতিক মামলা, আদালতপাড়া, দণ্ডাদেশ—সব মিলিয়ে দীর্ঘ কারাবন্দি জীবন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের শান্তি কেড়ে নেয়। অসুস্থ শরীর নিয়েও তাঁকে কাটাতে হয়েছে বছরের পর বছর গৃহবন্দিত্ব ও চিকিৎসাজনিত সীমাবদ্ধতায়। এই অধ্যায়টি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে বেদনাবিধুর সময়।
অসুস্থতা ও শেষ দিনগুলো
শেষ কয়েক বছরে বেগম খালেদা জিয়া একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসা, হাসপাতাল–বাস, সীমিত চলাচল—এসবের মধ্যেও তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে পারিবারিক ও দলীয় সূত্রগুলো জানায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল অটুট।
যে ত্যাগ ইতিহাসে রয়ে যাবে
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন কেবল ক্ষমতার গল্প নয়—এটি সহিষ্ণুতা, প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এবং ব্যক্তিগত ক্ষতিকে রাজনৈতিক দায়িত্বে রূপ দেওয়ার গল্প। সমর্থকরা তাঁকে দেখেছেন আপসহীন নেত্রী হিসেবে, আর সমালোচকরাও স্বীকার করেন—তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক অমোঘ নাম।
শোকবার্তা
দৈনিক আমাদের সমাচার পরিবার গভীর শ্রদ্ধা ও শোকের সঙ্গে স্মরণ করছে এই রাষ্ট্রনায়িকাকে। তাঁর জীবন ও ত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে থাকবে—সমর্থন ও বিরোধ, উভয় ধারায়।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন






