কারাবন্দি অবস্থাতেই উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন সাবিনা আক্তার তুহিন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ছাত্রী তুহিনকে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানালে মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জি. এম. ফারহান ইশতিয়াকের আদালত তা মঞ্জুর করেন। তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোরশেদ হোসেন শাহীন আদালতে জানান—কারাগারে থেকেও যেন তুহিন বই পড়তে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন, সেই মানবিক বিবেচনা থেকেই এই আবেদন করা হয়।
গত ২৩ জুন রাতে ঢাকার নবাবগঞ্জের নিজ বাসা থেকে তুহিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ মোট পাঁচটি গুরুতর মামলা চলমান। মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। কারাগারের সীমিত পরিবেশে তুহিন বর্তমানে মূলত নির্জন জীবন কাটাচ্ছেন—এই সময়ে বই ও পড়াশোনাই তার প্রধান সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে একসময় আলোচিত ও প্রভাবশালী নেতৃত্বের মধ্যে ছিলেন সাবিনা আক্তার তুহিন। আওয়ামী লীগ–সমর্থিত নারী নেতৃত্বের শীর্ষ সারিতে থাকা তুহিন ২০১৪ সালের মার্চে সংরক্ষিত নারী আসন–৩৫ থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও ছিলেন সক্রিয়। দলের ক্ষমতার বৃত্তে তিনি দ্রুতই দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। দলীয় সূত্রের দাবি—সংরক্ষিত আসনের হলেও বাস্তবে ঢাকা–১৪ আসনে ছিল তার শক্ত উপস্থিতি ও আধিপত্য।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ, সমালোচনা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধে তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির মতো নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ওঠে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–১৪ আসনের মনোনয়ন না পেয়ে প্রকাশ্যে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিলেও পরে আবার সক্রিয় হন তিনি। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন, যদিও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন।
গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন। প্রায় এক বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পর অবশেষে গত ২৩ জুন রাতে নবাবগঞ্জের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতা বলেন—একসময় যার উপস্থিতিতে ক্ষমতার করিডোর থাকত সরগরম, সেই সাবিনা আক্তার তুহিন আজ কারাগারের অন্ধকার সেলে দিন কাটাচ্ছেন। তুহিনের কারাজীবন নতুন নয়—দলের কঠিন সময়ে অতীতেও তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। এমনকি সদ্যোজাত সন্তানকে রেখে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল তাকে।
বর্তমানে রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়ায় তিনি অনেকটাই একঘরে। গুরুতর মামলার আইনি লড়াই তার ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তবুও কারাগারে বসে পড়াশোনার অনুমতি পাওয়া তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশার আলো।
মানবিক এই সিদ্ধান্ত একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা—যাতে তিনি অন্তত শিক্ষার আলোয় নিজের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন।






