ফসলের মাঠে কৃষকের ব্যস্ত সময়। আমনসহ বিভিন্ন ফসলের পরিচর্যায় নিয়মিত প্রয়োজন সার। কিন্তু জামালপুরের বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের কর্মঘণ্টা, অন্যদিকে সময়মতো ফসলে সার প্রয়োগ নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
কৃষকদের অভিযোগ, দিন যত যাচ্ছে বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে সারের জন্য অপেক্ষার সারিও তত দীর্ঘ হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পেয়ে অনেক কৃষককে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ।
সাত উপজেলা ও আট পৌরসভা নিয়ে গঠিত জামালপুর জেলায় কৃষকদের সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে ২১৯টি বিসিআইসি ও ৪৭টি বিএডিসি ডিলার পয়েন্ট থেকে। সরেজমিনে বিভিন্ন ডিলার পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই সার নিতে কৃষকদের ভিড় বাড়তে থাকে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হয় অপেক্ষার সারি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও প্রয়োজনমতো সার না পাওয়ায় দেওয়ানগঞ্জের সানন্দবাড়ীর লংকারচর এলাকার বাদশা মিয়াসহ একাধিক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ও চরগোয়ালিনী ইউনিয়নের শাহালম, নবাব আলী, দুলাল মিয়াসহ একাধিক কৃষক জানান, ফসলের পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারের পেছনেই দিনের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে। ডিলার পয়েন্টে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে খোলা বাজারে যাচ্ছেন। সেখানে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
শুধু সার সরবরাহ নয়, ডিলার পয়েন্ট নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কৃষকেরা। মেলান্দহ উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের মুনু মিয়া ও শ্যামপুর ইউনিয়নের আমডাঙা গ্রামের কৃষক কামাল মিয়াসহ একাধিক কৃষকের অভিযোগ, বিভিন্ন ইউনিয়নে ডিলার পয়েন্ট নির্ধারণে নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন ডিলার থাকার কথা থাকলেও কোথাও একজন, আবার কোথাও চার থেকে পাঁচজন ডিলার রয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।
জেলা কৃষি অফিস ও কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নে রয়েছে মাত্র একজন ডিলার। বিপরীতে বগারচর ইউনিয়নে রয়েছে পাঁচজন ডিলার। মেলান্দহ উপজেলার কুলিয়া ও ফুলকোঁচা ইউনিয়নে দুটি করে ডিলার পয়েন্ট রয়েছে। অন্যদিকে শ্যামপুর ও নয়ানগর ইউনিয়নে রয়েছে চার থেকে পাঁচটি করে ডিলার পয়েন্ট। ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নে দুটি এবং সাপধরী ইউনিয়নে রয়েছে একটি ডিলার পয়েন্ট। এ ছাড়া বিএডিসির অধিকাংশ ডিলার পয়েন্ট পৌর শহরকেন্দ্রিক বলেও অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
গত কয়েকদিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, দেওয়ানগঞ্জের মেসার্স মুক্তা এন্টারপ্রাইজ, পলি এন্টারপ্রাইজ ও মহর এন্টারপ্রাইজের ডিলার পয়েন্ট গত বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকায় সার নিতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। এ অঞ্চলের অধিকাংশ ডিলার পয়েন্ট নিয়মিত খোলা না থাকার অভিযোগও রয়েছে তাদের।
কৃষকদের দাবি, যেসব ইউনিয়নে ডিলারের সংখ্যা বেশি, সেখানে বরাদ্দও বেশি যাচ্ছে। বিপরীতে কম ডিলার থাকা ইউনিয়নে তুলনামূলক কম বরাদ্দ পাওয়ায় সারের প্রাপ্যতায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। ফলে কোনো কোনো ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ লাইন তৈরি হলেও অন্য এলাকায় তুলনামূলক কম চাপ থাকছে।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরে এক লাখ ২০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আমন চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি দুই হাজার ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে বিভিন্ন ফসল ও সবজির চাষাবাদ চলছে। ফলে এ সময়ে কৃষকদের জন্য প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের দাবি, ডিলার পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘ লাইন কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাওয়ার নিশ্চয়তা চান তারা।
তবে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, ‘‘যে পরিমাণ ডিলার থাকার কথা, সে পরিমাণে নেই। নতুন নিয়োগ হলে এ সংকট কেটে উঠবে। আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করছি, কৃষকের শ্রম ও সময় যেন সারের লাইনে আটকে না থাকে। কৃষকরা যাতে স্বচ্ছতার সঙ্গে সার সংগ্রহ করতে পারেন, সেজন্য নিয়মিত পরিদর্শন করছি। তবে কিছু কৃষক গুজবে কান দিয়ে অগ্রিম সার কিনছেন।’’
শুধু সার মজুত থাকলেই হবে না, প্রয়োজনের সময়ে প্রয়োজনমতো সার কৃষকের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।






