সারাদেশ

কসবায় অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান, ধ্বংস দুই মেশিন

ফসলি জমি রক্ষায় কঠোর অবস্থান; ১,৫০০ ফুট পাইপ বিনষ্ট, অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় অবৈধ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে দুটি ড্রেজিং মেশিনের কার্যক্ষমতা নষ্ট করেছে উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ ফুট পাইপের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই ২০২৬) উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়নের তিনলাখ পীর এলাকার লোহার ব্রিজের দক্ষিণ পাশে অবৈধভাবে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মাটি কাটার অভিযোগের ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
অভিযান পরিচালনা করেন কসবা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির। মোবাইল কোর্ট টিমের উপস্থিতি টের পেয়ে ড্রেজিংয়ের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে থাকা দুটি ড্রেজিং মেশিনের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হয় এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফুট পাইপের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কসবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র অবৈধভাবে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি করে আসছিল। এতে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উপজেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক মোবাইল কোর্ট, জরিমানা, কারাদণ্ড এবং ড্রেজিং মেশিন ধ্বংসের মতো কঠোর পদক্ষেপের কারণে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনও কিছু ভূমিদস্যু প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে মাটি কাটার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে কসবা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির প্রতিনিধি‌কে বলেন, “অবৈধ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ফসলি জমির মাটি কাটা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। উপজেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। যেখানে অবৈধ ড্রেজিংয়ের তথ্য পাওয়া যাবে, সেখানেই তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কসবা উপজেলাকে অবৈধ ড্রেজারমুক্ত না করা পর্যন্ত আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ বিষয়ে আমরা স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা কামনা করছি।”
কসবা উপজেলা কৃষি অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিনিধি‌কে জানান, “ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর অধীনে সরকারি অনুমতি ছাড়া মাটি উত্তোলন বা বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পাশাপাশি ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এ আবাদযোগ্য জমির উপরিভাগের মাটি অবৈধভাবে অপসারণের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব আইন কৃষিজমির উর্বরতা রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তি বা চক্র যদি ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।”
এলাকার একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিনিধি‌কে জানান, দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে একটি চক্র ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করে আসছিল। এতে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সড়ক, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তারা উপজেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানের প্রশংসা করে বলেন, “অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হলে অবৈধ ড্রেজার ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ হবে এবং কৃষিজমি রক্ষা পাবে।”
দৈনিক আমাদের সমাচার অনলাইন মাল্টিমিডিয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি মো. মোস্তফা বলেন, “অবৈধ ড্রেজিং শুধু কৃষিজমির ক্ষতিই করছে না, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি। উপজেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে শুধু মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, অবৈধ ড্রেজিংয়ের নেপথ্যের অর্থদাতা, মাটি ব্যবসায়ী এবং ভূমিদস্যুদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, গণমাধ্যম ও সচেতন জনগণের সমন্বিত উদ্যোগে কসবাকে অবৈধ ড্রেজারমুক্ত করা সম্ভব।”
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফসলি জমি ও পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত থাকবে। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কসবা উপজেলা থেকে অবৈধ ড্রেজিং সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হবে এবং দেশের মূল্যবান কৃষিজমি সুরক্ষিত থাকবে।

Leave a Reply