সারাদেশ

সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মধ্যেও কসবা সীমান্তে থামছে না মাদকের স্রোত! পুলিশের অভিযানে ৩৬০ কেজি গাঁজা উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১

বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে দেশব্যাপী কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। তবে সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় একের পর এক বড় মাদক চালান উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও সীমান্ত দিয়ে কীভাবে শত শত কেজি মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে এবং এর পেছনে কারা রয়েছে—তা গভীরভাবে তদন্ত করে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

এরই ধারাবাহিকতায় কসবা থানার মাদকবিরোধী অভিযানে একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন পিকআপ ভ্যান থেকে ৩৬০ কেজি গাঁজা, দুটি মোবাইল ফোন এবং একটি পিকআপ ভ্যান জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় পিকআপের চালক মো. শাকিল (৩০), পিতা- মো. শফিক, মাতা- রুবি আক্তার, সাং- কালতা দিঘীরপাড়, কায়েমপুর ইউনিয়ন, থানা- কসবা, জেলা- ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পিকআপ থেকে নেমে আরও ২-৩ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি দৌড়ে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
থানা সূত্রে জানা যায়, সহকারী পুলিশ সুপার (কসবা সার্কেল) মো. নাজমুস সাকিবের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ আলী মোহাম্মদ রাশেদের নেতৃত্বে সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্স গত ১৯ জুলাই ২০২৬ বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে কসবা থানাধীন বিনাউটি ইউনিয়নের হাজীপুর এলাকায় মাহফুজ মিয়ার বাড়ির সামনে কদমতলী-সৈয়দাবাদ পাকা সড়কে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন পিকআপ ভ্যান তল্লাশি করে ৩৬০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে দুটি মোবাইল ফোন ও পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কসবা থানা পুলিশের দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে বিপুল পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর দাবি, কসবা সীমান্ত দিয়ে প্রায়ই বড় বড় মাদক চালান উদ্ধারের খবর সামনে আসে। কিন্তু এসব ঘটনার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। তাদের মতে, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শুধু মাদকের চালান জব্দ বা বাহক গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সীমান্তকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ চক্রকে ভেঙে দিতে না পারলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। বর্তমান সরকার যখন মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে, তখন সীমান্ত দিয়ে ধারাবাহিকভাবে বড় বড় মাদক চালান প্রবেশের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে তারা মন্তব্য করেন।
মাদক বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত দিয়ে এ ধরনের বড় চালান প্রবেশ প্রমাণ করে সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। শুধু বাহককে গ্রেপ্তার করলে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়; অর্থদাতা, পরিকল্পনাকারী, পরিবহনকারী, গ্রহণকারী এবং পুরো নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এর বিস্তারের কারণে যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে, পরিবারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সীমান্তে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোও জরুরি।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান অবশ্যই কঠোর হতে হবে, তবে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত মাদক গডফাদার, অর্থদাতা ও সংঘবদ্ধ চক্রকে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, ৩৬০ কেজি গাঁজার মতো বিশাল চালান উদ্ধারের পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় চালান কীভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছাল এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত। সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি শুধু একজন চালকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পেছনের পুরো নেটওয়ার্ক উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থার সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ আলী মোহাম্মদ রাশেদের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply