ফসলি জমি রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের জিরো টলারেন্সে স্বস্তি কৃষকদের; কৃষিবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজবিশেষজ্ঞদের মতে—অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে ধারাবাহিক অভিযানই হতে পারে টেকসই সমাধান
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় কৃষিজমি ধ্বংস ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা অবৈধ ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গত ৭২ ঘণ্টায় পৃথক দুটি অভিযানে এক ব্যক্তিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান, একাধিক ড্রেজার মেশিনের কার্যক্ষমতা বিনষ্ট এবং কয়েকশ’ ঘনফুট পাইপের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে এবং স্বস্তি ফিরেছে প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কসবার বিভিন্ন ইউনিয়নে এখনো কিছু অসাধু চক্র অবৈধভাবে ড্রেজার পরিচালনা করে কৃষিজমি ভরাট ও মাটি কাটার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছেন। তবে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আইনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় ১৬ জুলাই কসবা উপজেলার রাইতলা এলাকায়। কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগ পেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির সঙ্গীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি কৃষিজমি ইতোমধ্যে ভরাট করা হয়েছে এবং আরও জমি ভরাটের প্রস্তুতি চলছিল।
এ সময় ড্রেজারের পাইপ অপসারণ ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিলে মো. জাহাঙ্গীর ভুঁইয়া (৫৫) ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজে বাধা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি মোবাইল কোর্ট টিমকে হুমকি দেন এবং আক্রমণেরও চেষ্টা করেন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে তাৎক্ষণিকভাবে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।
উপজেলা প্রশাসন জানায়, এর আগেও শ্যামবাড়ী বিল এলাকায় কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি বারবার অবৈধ ড্রেজিংয়ে জড়িয়ে পড়ছেন।
এরপর ১৮ জুলাই কসবা উপজেলার ৮ নম্বর কুটি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিষ্ণুপুর গ্রামে দ্বিতীয় দফায় ড্রেজিংবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। মোবাইল কোর্ট টিমের উপস্থিতি টের পেয়ে ড্রেজার পরিচালনাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে দুটি ড্রেজার মেশিনের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করা হয় এবং কয়েকশ’ ঘনফুট পাইপের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। অভিযানটি পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির।
এ বিষয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির বলেন, “কৃষিজমি, জলাশয় ও পরিবেশ রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। অবৈধ ড্রেজিংয়ের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও আরও জোরদারভাবে অব্যাহত থাকবে।”
কসবা-আখাউড়া আসনের সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান বিভিন্ন সময় মাদক ও অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের চলমান অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ ড্রেজিং সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হবে এবং কৃষিজমি রক্ষা পাবে।
কসবার ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক কৃষক বলেন, “ড্রেজারের কারণে আমাদের ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন যেভাবে অভিযান শুরু করেছে, তা অব্যাহত থাকলে কৃষকরা উপকৃত হবে এবং কৃষিজমি রক্ষা পাবে।”
একজন কৃষিবিদ বলেন, “ফসলি জমিতে অবৈধভাবে মাটি ভরাট ও ড্রেজিং চলতে থাকলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়, খাদ্য উৎপাদন কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। কৃষিজমি সংরক্ষণে প্রশাসনের এই ধরনের অভিযান অত্যন্ত সময়োপযোগী।”
একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন, “পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে আইনের যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটি অভিযানে আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার নিশ্চিত করেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।”
একজন সমাজবিশেষজ্ঞের ভাষ্য, “অবৈধ ড্রেজিং শুধু পরিবেশের ক্ষতি করে না, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যও নষ্ট করে। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসচেতনতা একসঙ্গে কাজ করলে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, কসবা উপজেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক এই অভিযান অব্যাহত থাকলে অবৈধ ড্রেজার ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হবে এবং কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সাধারণ মানুষও অবৈধ ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন।






