বাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার মরদেহ, প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা—ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনই খুলবে রহস্য
স্থানীয়রা বলছে যৌতুক–নির্যাতনের অভিযোগ স্পষ্ট, তবু মামলা নেই—পুলিশের নীরবতায় পালাল অভিযুক্তরা
রাজধানীর মিরপুরে যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে তরুণী গৃহবধূ আশা মনির মর্মান্তিক মৃত্যুর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো মামলা গ্রহণ করেনি পুলিশ। সুস্পষ্ট নির্যাতনের অভিযোগ, পরিবারের লিখিত আবেদন ও স্থানীয়দের বক্তব্য থাকা সত্ত্বেও পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, মামলা গ্রহণে গড়িমসির সুযোগে অভিযুক্তরা নির্বিঘ্নে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
নিহত আশা মনি মিরপুর শাহ আলী থানাধীন এ ব্লক শাহ আলী নগর এলাকার দুই নম্বর রোডের ১৭ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয় সূত্র ও ওই বাড়ির ভাড়াটিয়ারা জানান, শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের আশা মনি মাত্র পাঁচ থেকে সাত মাস আগে নাইম দেওয়ানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বিয়ের পরপরই স্বামী নাইম দেওয়ান তার কথিত ব্যবসার অজুহাতে আশার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা আদায় করেন। কিন্তু সেই অর্থ পাওয়ার পরও লোভ থামেনি। এক মাস না যেতেই আবারও অতিরিক্ত টাকার দাবি তোলা হয়। পরিবার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
অভিযোগ রয়েছে, স্বামী নাইম দেওয়ান, তার মা নাসরিন এবং তিন বোন একযোগে একাধিকবার আশা মনির ওপর নির্যাতন চালান। সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় সবকিছু নীরবে সহ্য করলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি তার জীবন। গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যু হয় এই তরুণী গৃহবধূর।
নিহতের মা অভিযোগ করে বলেন, মেয়ের মৃত্যুর পর মামলা দায়েরের জন্য তিনি একাধিকবার শাহ আলী থানায় গিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না আসার অজুহাতে এখনো মামলা গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণমাধ্যমকে বলেন,
“আশা মনির মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। রিপোর্ট অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের নির্যাতনের অভিযোগ, পারিবারিক সহিংসতার স্পষ্ট ইতিহাস এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু থাকার পরও কেন প্রাথমিক মামলা বা অন্তত একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করা হয়নি? অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের এই বিলম্বের সুযোগে অভিযুক্ত নাইম দেওয়ান, তার মা নাসরিন ও তিন বোন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
আইনগত প্রশ্নে পুলিশের অবস্থান
আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট মামলা গ্রহণের পূর্বশর্ত নয়। ফৌজদারি কার্যবিধি ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে মৃত্যুর কারণ চূড়ান্ত না হলেও মামলা গ্রহণ ও তদন্ত শুরু করা পুলিশের আইনগত দায়িত্ব। মামলা গ্রহণে দেরি করা আলামত নষ্ট, সাক্ষী প্রভাবিত এবং অভিযুক্তদের পলাতক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে—যার দায় এড়ানো যায় না।
নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং তা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে।
এক তরুণ গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ এবং মামলা গ্রহণে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা—সব মিলিয়ে মিরপুর শাহ আলী নগর এলাকায় বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি ও চাপা ক্ষোভ।
নিহতের পরিবার দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, মামলা গ্রহণ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছে।






