খেলাধুলা

ক্লান্তিহীন জীবন, সংগ্রামে বাঁচতে চান সুমাইয়া

সামার অ্যাথলেটিকসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে খেতাবধারী শিরিন আক্তারকে হারিয়ে অ্যাথলেট সুমাইয়া দেওয়ান এবার দ্রুততম মানবী হয়েছেন। কিন্তু তার ভেতরে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। সুমাইয়া যেন অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তার চলাফেরায় চাকচিক্য নেই। দ্রুততম মানবী হওয়ার পরও সুমাইয়া আগে যা ছিলেন, সেই সাদামাটা, হই হুল্লোড় নেই। মাত্রই ১০০ মিটার জয় করে ফেরা, তবু যেন কিছুই হয়নি। শান্ত স্বভাবের মেয়ে। খুব সুন্দর করে কথা বলেন, খুব চুপচাপ থাকেন। কথা বললে, পরিবার নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে সহজেই সব কথা বেরিয়ে আসে না। লুকিয়ে রাখেন তার ভেতরে জমিয়ে রাখা কথ্য। সামনে এগিয়ে যেতে চান, সুন্দর গঠন করতে চান।

শুক্রবার (২২ আগস্ট) ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে দৌড় শেষ করে ট্র্যাকে লুটিয়ে পড়েছিলেন সুমাইয়া। তার ডান পায়ের চামড়া উঠে যায়। এখনো সেখানে ব্যথা অনুভব করছেন সুমাইয়া। ট্রাউজার পরলেও সেটি গুটিয়ে হাঁটুর ওপরে তুলে রাখতে হচ্ছে। এই অবস্থায় ২০০ মিটার স্প্রিন্টে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

মানিকগঞ্জ গড়পাড়া আংলী নগর সদরে সুমাইয়ার বাড়ি। কৃষকের সন্তান সুমাইয়া বিকেএসপি থেকে এখন নৌবাহিনীর খেলোয়াড়। বাবা মারা গেছেন ২০২০ সালে। কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর মা সাজেদা বেগমের হাতে দায়িত্ব পড়েছিল, তিনিও কৃষিকাজ করে সংসার চালান। কিন্তু সেই টাকায় খুব একটা সচ্ছলতার মুখ দেখা যায় না। বাড়ির তিন সন্তানের মধ্যে সুমাইয়া বড়। সংসারের হাল তার হতেই বলা যায়।

‘সংসার আমার উপরেই চলে। আর ফ্যামিলি থেকে যে রোজগারটা আসে, কৃষিকাজ থেকে আয় আসে। আমাদের জমি আছে। জমি চাষ করে যতটুকু আয় হয়। আর আমি আমার নৌবাহিনী থেকে যতটুকু ইনকাম করি দুইটা মিলেই সংসার চলে-বললেন সুমাইয়া দেওয়ান।

২০২২ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিকসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সোনার পদক জয় করেছিলেন সুমাইয়া। সেটি হারিয়ে ফেলেছেন শিরিন আক্তারের কাছে। আফসোস নেই। তক্কে তক্কে ছিলেন, কীভাবে সেরা পদক জয় করা যায়। রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সুমাইয়ার। দিনরাত এক করে ফেলেছিলেন অনুশীলন ট্র্যাকে। ‘এমনও দিন গেছে, আমি তিন বেলা অনুশীলন করেছি। সকালে দুপুরে বিকালে অনুশীলন করতে হয়েছে, বললেন সুমাইয়া।

সুমাইয়ার সাফল্যের পেছনে তার কোচের নামটা বলতে ভুল করেননি, ড. মেহেদী হাসানের সঙ্গে প্ল্যান করে সুমাইয়া নিজের হারানো জায়গা ফিরে পাওয়ার লড়াই শুরু করেন। ‘২০২৩ সালে আমি আমার মুকুটটা হারিয়েছিলাম। সেই থেকে নিজের মধ্যে জেদ ছিল কীভাবে আমি আমার জায়গাটা ফিরে পাবো। আমার চেষ্টা পরিশ্রম দিয়ে এত দূর আসতে পেরেছি। আমার কোচ আর আমি অনুশীলন সিডিউল সাজিয়েছিলাম। আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে’, বললেন সুমাইয়া।

ইন্টার স্কুল খেলে বিকেএসপিতে ভর্তি হন সুমাইয়া। নিজের পরিবারের কেউ কখনো অ্যাথলেটিকস করেনি। বললেন, ‘বাবা-চাচারা ফুটবল খেলছেন। কিন্তু কেউ আমার মতো অ্যাথলেটিকসে খেলতে আসেননি। আমি-ই প্রথম। গ্রামের এলাকায় সবাই আমাকে সাপোর্ট করে। হাফপ্যান্ট পরে কেন খেলি, কেন বিয়ে করি না। এ ধরনের কোনো বাধা আসেনি। এলাকার সবাই আমাকে সাপোর্ট করে অভিনন্দন জানায়। তখন আনন্দে আমার কান্না এসেছে অনেকবার।’

সুমাইয়া ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে লড়াই করেন। তার কাছে দুটাই ভিন্ন রকম আনন্দ দেয়। তিনি বলনে, ‘আমি দুইটা দৌড়ের মধ্যে কোনটা বেশি পছন্দ করছি। প্রথমবার যখন ফার্স্ট হয়েছিলাম, প্রথম অনুভূতিটা তো ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আর এখন আমি আগের জায়গাটায় আসতে পেরেছি। সেটা আরও আনন্দময়। দুইটা দুই রকম দেখি।’

সূত্র : ইত্তেফাক
নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply