রমজান যখন তার শেষ প্রহরে এসে দাঁড়ায়, তখন মুমিনের হৃদয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা ও বিষণ্ণতা নেমে আসে। যে দিনগুলো একসময় দীর্ঘ মনে হতো, তা বালুর মতো হাত ফসকে দ্রুত ফুরিয়ে যায়। এই শেষ মুহূর্তগুলোর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশেষ মহিমান্বিত দিন—জুমাতুল বিদা।
এটি কেবল রমজানের শেষ শুক্রবার নয়, বরং একটি পবিত্র সফরের সমাপ্তি এবং বিদায়ের সুর। যেখানে মিশে থাকে সিয়াম, সালাত, ধৈর্য আর ত্যাগের গভীর এক অনুভূতি। এই দিনে মুমিনের হৃদয়ে একই সাথে খেলা করে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং প্রিয় মাসকে বিদায় জানানোর অব্যক্ত বেদনা।
ভোর থেকেই চারপাশের পরিবেশে এক স্নিগ্ধ পরিবর্তন অনুভূত হয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় মানুষ অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা আগেই মসজিদের পানে ছুটে যায়।
সেখানে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের; ধনী-দরিদ্র, বৃদ্ধ-যুবক সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে ইসলামের চিরন্তন সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শক্তি।
খুতবার প্রতিটি শব্দ যখন ক্ষমা, পরকাল এবং জীবনের অস্থায়ী বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়, তখন প্রত্যেকের মনে এই আশঙ্কার উদয় হয়—এটাই কি তবে আমার জীবনের শেষ জুমাতুল বিদা?
সেই আকুতি থেকেই মোনাজাতের সময় দুহাত যখন আসমানের পানে ওঠে, তখন অশ্রুসিক্ত চোখে কেবলই ঝরতে থাকে ক্ষমা ও কবুলিয়তের প্রার্থনা।
তবে জুমাতুল বিদা কেবল ইবাদতগাহের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকার দিন নয়। মসজিদের আলো ঝলমলে পরিবেশের বাইরেও একটি রূঢ় বাস্তবতা বিদ্যমান।
আমাদের আশেপাশেই এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের ঘরে হয়তো পর্যাপ্ত ইফতারের আয়োজন নেই, যাদের রোজা কাটে কেবলই চরম ধৈর্যের পরীক্ষায়। রমজানের প্রকৃত শিক্ষা হলো এই অভাবী ও নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
যারা জানে না পরের বেলা কী দিয়ে ইফতার করবে, সেইসব অসহায় মানুষ, এতিম শিশু, জীবনযুদ্ধে লড়াই করা বিধবা নারী কিংবা শারীরিক প্রতিকূলতা জয় করে বেঁচে থাকা মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মূলত মানুষের সেবার মাধ্যমেই ইবাদত পূর্ণতা পায়।
একইভাবে দ্বীনের সেবায় নিয়োজিত মাদ্রাসার ছাত্ররা, যারা অতি সাধারণ জীবন যাপন করেও কুরআনের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের সহায়তা করা ইসলামের ভবিষ্যতের জন্যই এক বড় বিনিয়োগ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দানশীল মানুষ, আর রমজানে তাঁর দানের হাত হতো আরও প্রসারিত। জুমাতুল বিদা আমাদের সেই ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রদর্শনের জন্য নয় বরং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমাদের অকাতরে বিলিয়ে দিতে হবে।
রমজান মাস চিরস্থায়ী নয়, জুমাতুল বিদাও বারবার ফিরে আসে না। গত বছর যারা আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়েছিলেন, তাদের অনেকেই আজ কবরের বাসিন্দা। এই অমোঘ সত্যটি আমাদের সাধারণ আমলকেও অসাধারণ করে তোলে।
প্রকৃত সফলতা কেবল রমজান সুন্দরভাবে কাটানোর মধ্যে নয়, বরং রমজানের শিক্ষা—যেমন নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং আর্তমানবতার সেবা—সারা বছর আমাদের জীবনে কতটা বজায় থাকল, তার ওপরই নির্ভর করে।
জুমাতুল বিদা তাই কেবল একটি বিদায়ের দিন নয়; এটি আত্মোপলব্ধি, নতুন করে দায়িত্ব নেওয়া এবং আর্তমানবতার পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। হয়তো এই অসহায় মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমেই আমাদের পুরো মাসের ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হতে পারে।
ড. ইঞ্জিনিয়ার এইচ এম রমজান পাশা
বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও সমাজসেবক






