রমাদান আসে, রমাদান যায়। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে মাসটি শেষ হয়ে গেলে আমরা আবার ফিরে যাই আমাদের চিরচেনা যান্ত্রিক জীবনে। কিন্তু প্রতি বছর এই পবিত্র মাসটি আমাদের হৃদয়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই বদলেছি? নাকি আমাদের পরিবর্তন সীমাবদ্ধ ছিল সাহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাসের মধ্যেই?
রমাদান কেবল পানাহার বর্জনের নাম নয়; এটি মূলত আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার এক নিবিড় পাঠশালা। আল্লাহ তায়ালা চাইলে ইবাদতের ভিন্ন কোনো বিধান নির্ধারণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ‘ক্ষুধা’কেই বেছে নিয়েছেন। কারণ, ক্ষুধার কোনো ভাষা নেই, অথচ তার যন্ত্রণা সর্বজনীন। এই যন্ত্রণা মানুষকে মানুষে যুক্ত করে, হৃদয়কে নরম করে এবং দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
রোজার ক্ষুধা আমাদের শেখায়—ক্ষুধা কেমন লাগে। যেন আমরা অনুভব করতে পারি সেইসব মানুষদের জীবন, যাদের জন্য ক্ষুধা কোনো ঐচ্ছিক ইবাদত নয়; বরং প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। এই উপলব্ধিই রোজার মূল দর্শন—নিজেকে সংযত করা এবং অন্যের কষ্টকে নিজের অনুভূতিতে জায়গা দেওয়া।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। এই হাদিস কেবল ব্যক্তিগত নেকি অর্জনের কথা বলে না; বরং এটি রোজার একটি সামাজিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে। ইসলাম আমাদের শেখায়—ইবাদত তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের কল্যাণে রূপ নেয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের রমাদান অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে পারিবারিক আয়োজন, পরিচিতজনদের ইফতার পার্টি এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে। অথচ প্রকৃত রমাদান তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন আমরা এমন কাউকে খুঁজি—যাকে কেউ মনে রাখেনি। হোক সে রাস্তার ধারের কোনো মুসাফির, কোনো মাদরাসার এতিম শিক্ষার্থী, কিংবা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো লাজুক মধ্যবিত্ত পরিবার—যারা অভাবের কথা প্রকাশ করে না, কিন্তু নীরবে অপেক্ষা করে।
কাউকে ইফতার করানো মানে কেবল তার প্লেটে খাবার তুলে দেওয়া নয়। এটি তার কষ্ট লাঘব করা এবং তাকে একজন মানুষ হিসেবে সম্মান দেওয়া। ইসলামে দান এমনভাবে করার নির্দেশ রয়েছে, যাতে গ্রহণকারীর মর্যাদায় বিন্দুমাত্র আঘাত না লাগে। রমাদান আমাদের এই শিক্ষাই দেয়—যিনি দিচ্ছেন, তিনি বড় নন; বরং আল্লাহ যাকে দেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন, প্রকৃত সৌভাগ্যবান তিনিই।
লাইলাতুল কদর আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—ফিরে এসো, মানবিক হও, দায়িত্ব নাও। একটি রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম হয়ে ওঠে তখনই, যখন সেই রাতের ইবাদত আমাদের হৃদয়কে আরও কোমল করে এবং হাতকে আরও উদার করে তোলে।
রমাদান শেষে যদি আমাদের সমাজ আরও মানবিক না হয়, যদি আমরা প্রতিবেশীর ক্ষুধা অনুভব করতে না শিখি, তবে আমাদের দীর্ঘ উপবাস কেবল একটি শারীরিক অনুশীলন হয়েই থেকে যাবে। কারণ, স্রষ্টা আমাদের রোজার দৈর্ঘ্য পরিমাপ করবেন না; তিনি দেখবেন আমাদের দায়িত্ববোধের গভীরতা।
আসুন, রমাদানকে কেবল নিজের নাজাতের মাসে সীমাবদ্ধ না রেখে একে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মাসে রূপান্তর করি। মনে রাখবেন—যে একজন রোজাদারকে তৃপ্ত করে, সে শুধু একটি দেহকে খাদ্য দেয় না; সে একটি আত্মাকে টিকে থাকার শক্তি জোগায়।
লেখক: ইসলামিক স্কলার ও সমাজসেবক ড. ইঞ্জিনিয়ার এইচ এম রমজান পাশা






