রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভে নগ্ন হস্তক্ষেপ; গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি
দেশে যখনই যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তখনই কোনো না কোনোভাবে গণমাধ্যমকর্মীরা নির্মম নির্যাতন, নিপীড়ন, মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই দমন-পীড়ন যে মাত্রায় এবং যে নগ্নতায় সামনে আসছে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গভীর আশঙ্কার বার্তা বহন করছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে, ৫ আগস্ট -এর পর থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে যে ধরনের নগ্ন ও সমন্বিত হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটছে, তা গভীর উদ্বেগজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলো।
শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ টাইমস-এর অফিস থেকে একযোগে ২১ জন সাংবাদিককে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের স্পষ্ট পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ।
এই স্তম্ভ দুর্বল হলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়া অবশ্যম্ভাবী।
ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাই গণমাধ্যমের মৌলিক দায়িত্ব।
অথচ সেই দায়িত্ব পালনের পথ রুদ্ধ করতে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, বেআইনি আটক কিংবা তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভয়াবহ বার্তা বহন করছে।
এ বিষয়ে মানবাধিকার ও গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেবল পেশাগত পরিচয়ের কারণে সাংবাদিকদের আটক বা তুলে নেওয়া আইনের শাসনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
এ ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে নিশ্চিতকৃত মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
তারা আরও বলেন, যে রাষ্ট্রে কলমকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে সত্যের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে এবং নীরবতাই শাসকের প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়।
গণমাধ্যমকে দমন করার অর্থ জনগণের কণ্ঠরোধ করা এবং গণতন্ত্রকে শ্বাসরুদ্ধ করার শামিল।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার নেতৃবৃন্দের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সাংবাদিকদের টার্গেট করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সাংবাদিকতার কাজকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্পষ্ট অপব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মতভিন্নতা ও সমালোচনাকে দমন করার প্রবণতাই রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দেয়।
তারা অবিলম্বে আটক সাংবাদিকদের নিঃশর্ত মুক্তি, ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
পাশাপাশি ভবিষ্যতে গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনি নিশ্চয়তা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন।
সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভে আঘাত মানেই রাষ্ট্রের ভিত্তিতে আঘাত—আর ইতিহাস এমন দুঃশাসনের বিচার একদিন ঠিকই করে।






