অন্যান্য

পবিত্র কুরআনের আলোয় ব্যক্তি ও সমাজ পুনর্গঠনের আহ্বান

নৈতিক অবক্ষয়, বৈষম্য ও হতাশার এই সময়ে কুরআনই হতে পারে ব্যক্তি, সমাজ ও উম্মাহর টেকসই দিশারি

নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বৈষম্য ও মানসিক অস্থিরতায় যখন বিশ্বব্যবস্থা গভীর সংকটে, তখন পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনাই মানবজাতির জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথনকশা—এমনটাই মনে করেন ইসলামিক স্কলার ও সমাজসেবক ড. ইঞ্জিনিয়ার এইচ এম রমজান পাশা।

তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ভূখণ্ডের জন্য নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত এক চিরন্তন পথনির্দেশ। এটি শুধু আখিরাতকেন্দ্রিক গ্রন্থ নয়, বরং দুনিয়ার বাস্তব জীবন, সামাজিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ গঠনেরও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়।

কুরআন নিজেকে ‘হিদায়াত’ ও ‘নূর’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে—যে আলো মানুষের চিন্তা, চেতনা ও অন্তরের অন্ধকার দূর করে। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে যখন মানুষ বিভ্রান্ত হয়, তখন কুরআন ন্যায় ও অন্যায়ের একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড স্থাপন করে দেয়।

ড. রমজান পাশার মতে, কুরআনের শিক্ষা প্রথমেই মানুষের অন্তরকে সংশোধন করে। কারণ অন্তর পরিশুদ্ধ না হলে বাহ্যিক সংস্কার টেকসই হয় না। তাকওয়া, আল্লাহভীতি ও জবাবদিহির অনুভূতি মানুষকে প্রকাশ্য ও গোপন—উভয় অবস্থায়ই সংযমী ও নৈতিক রাখে।
তিনি বলেন, কুরআনের আলোয় গড়ে ওঠা মানুষ সত্যবাদী, আমানতদার ও দায়িত্বশীল হয়। এই নৈতিক দৃঢ়তাই সমাজে আস্থা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে, যা আজকের সমাজে সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত।

ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে কুরআন সমাজব্যবস্থার প্রতিও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও ভারসাম্যের প্রশ্নে কুরআনের অবস্থান আপসহীন। শক্তিশালী ও দুর্বল, ধনী ও দরিদ্র—সবার জন্য একই ন্যায়বিচারের নীতি কুরআন প্রতিষ্ঠা করেছে। জুলুম ব্যক্তি হোক বা রাষ্ট্রীয়—কোনো ক্ষেত্রেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।

বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য, শোষণ ও ন্যায়বিচারের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কুরআনের শিক্ষা কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর সামাজিক দর্শন। এই দর্শন অনুসরণ করা গেলে সমাজে শান্তি, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব।
কুরআন জ্ঞানচর্চার বিরোধী নয়—বরং মানুষকে চিন্তাশীল ও অনুসন্ধিৎসু হতে উদ্বুদ্ধ করে। ইতিহাস পর্যবেক্ষণ, প্রকৃতি নিয়ে ভাবনা এবং আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয় এই গ্রন্থ। কুরআনের আলোয় অর্জিত জ্ঞান মানুষকে অহংকারী নয়, বরং বিনয়ী করে তোলে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম উম্মাহ যখন কুরআনকে জীবনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে, তখন তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতায় নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যখন কুরআনকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, তখন সেই বিচ্ছিন্নতাই উম্মাহর দুর্বলতার কারণ হয়েছে।

সংকট ও বিপর্যয়ের সময় কুরআন মানুষের জন্য আশার বাতিঘর হিসেবে কাজ করে। ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর ওপর আস্থার শিক্ষা মানুষকে মানসিকভাবে দৃঢ় রাখে এবং হতাশা থেকে রক্ষা করে।

কুরআন দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে না; বরং দায়িত্বশীল দুনিয়াবি জীবন ও আখিরাতের জবাবদিহির মাঝে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে—যা ইসলামের মধ্যমপন্থার অনন্য দৃষ্টান্ত।

ড. রমজান পাশা মনে করেন, উম্মাহর ইতিহাসে প্রতিটি নবজাগরণই কুরআনের দিকে ফিরে আসার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। কুরআনের আলো বিভক্তি নয়, বরং ঈমানের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলে। বর্তমান সংকটময় সময়ে কুরআনের দিকে প্রত্যাবর্তন আবেগ নয়—এটি সময়ের বাস্তব ও যৌক্তিক দাবি।

সবশেষে তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য আল্লাহ তা‘আলার সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরেই কুরআনের আলো ছাড়া টেকসই কল্যাণ সম্ভব নয়। যে জাতি এই আলো গ্রহণ করবে, তার জন্য দুনিয়ায় সম্মান ও আখিরাতে সফলতা অনিবার্য।

লেখক : ড. ইঞ্জিনিয়ার এইচ এম রমজান পাশা, ইসলামিক স্কলার ও সমাজসেবক

নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply