ইরানে পৃথক দুটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের পর এবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আরেক শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে চারজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গ্যাস লিক থেকেই এসব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ— সব মিলিয়ে দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, দেশটির উপসাগরীয় উপকূলবর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাসে একটি আবাসিক ভবনে বিস্ফোরণে একজন নিহত এবং অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন বলে ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা মেহের-কে জানিয়েছেন এক স্থানীয় কর্মকর্তা। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহভাজে আরেকটি বিস্ফোরণে চারজন নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় তেহরান টাইমস পত্রিকা জানিয়েছে।
এই বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো এমন এক সময় ঘটল যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছাতে ওয়াশিংটনের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘কথা বলছে’। বন্দর আব্বাসের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, মোআল্লেম বুলেভার্ড এলাকায় অবস্থিত আটতলা একটি ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ভবনের দুটি তলা ধ্বংস হয়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একাধিক যানবাহন ও দোকান।
স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের প্রধান মোহাম্মদ আমিন লিয়াকাত বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস লিক হয়ে জমে থাকা গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণটি ঘটেছে। মেহের প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমার সহকর্মীরা বিস্তারিত তথ্য জানাবেন’। আঞ্চলিক কর্মকর্তা মেহরদাদ হাসানজাদেহ মেহেরকে জানান, আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব নাকচ করে আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ওই বিস্ফোরণে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনীর কোনও কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
অন্য বিস্ফোরণটি ঘটে ইরাক সীমান্তবর্তী আহভাজ শহরের কিয়ানশাহর এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে। তেহরান টাইমস জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া এক শিশুকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে, তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা আলোচনা করছে’। একইসঙ্গে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সম্পর্কে মিত্র দেশগুলোকেও সবকিছু জানানো সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘দেখা যাক আমরা কিছু করতে পারি কি না, না হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখা হবে। সেখানে আমাদের একটি বড় নৌবহর যাচ্ছে’।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, কোনও সংঘাতই দুই দেশের বা পুরো অঞ্চলের স্বার্থে ভালো কিছু নয়। এএফপির বরাতে ইরানের প্রেসিডেন্সির এক বিবৃতিতে বলা হয়, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে টেলিফোন আলাপে তিনি বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনও যুদ্ধ চায়নি এবং কোনোভাবেই যুদ্ধ চায় না।’
এছাড়া শনিবার তেহরানে কাতারের প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠকে অঞ্চলের উত্তেজনা কমানোর চলমান প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়।
লারিজানি এর আগের দিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বলে ক্রেমলিন জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘মনগড়া মিডিয়া যুদ্ধের প্রচারণার বিপরীতে, আলোচনার কাঠামোগত প্রস্তুতি এগিয়ে যাচ্ছে।’
এছাড়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তেহরান প্রস্তুত। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনোই আলোচনার বিষয় হবে না।
এর আগে গত বুধবার ট্রাম্প তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর সময় ‘ফুরিয়ে আসছে’। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। ট্রাম্প আরও বলেন, সামরিক পদক্ষেপ এড়াতে ইরানকে অবশ্যই ‘বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ’ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজার ৩০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ১৭ হাজার মৃত্যুর খবর তদন্তাধীন রয়েছে।






