গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দখলদার ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালানোর পাশাপাশি যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে নির্ধারিত সীমা ‘হলুদ রেখা’ অতিক্রম করে আরও ভেতরে অগ্রসর হয়েছে। এতে করে উপত্যকার পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত দখলে নিয়ে ফিলিস্তিনিদের আরও সংকুচিত ও গাদাগাদি করে বসবাসে বাধ্য করা হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিদের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী পূর্ব গাজায় তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ আরও সম্প্রসারিত করেছে। বিশেষ করে গাজা শহরের পূর্বাংশের তুফাহ, শুজাইয়া ও জাইতুন এলাকায় এই সীমা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ওই এলাকার বাসিন্দা ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয়ের পরিসর আরও ছোট হয়ে আসছে।
সোমবার ইসরায়েলি বাহিনীর এই অগ্রযাত্রা গাজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়ক সালাহ আল-দিন স্ট্রিটের আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এতে সড়কটির আশপাশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো তীব্র হুমকির মুখে পড়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান থামার কোনো ইঙ্গিত আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমানে গাজার ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা কার্যত ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, প্রতিদিন তা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। এসব লঙ্ঘনের ফলে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৪১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ হাজার ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি হানি মাহমুদ জানিয়েছেন, ‘মাঠপর্যায়ে চলমান ইসরায়েলি হামলা এবং ইয়েলো লাইনের সম্প্রসারণের মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্ব অংশের আরও এলাকা দখল করে নেওয়া। এর ফলে মানুষের আশ্রয়ের মোট এলাকা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘এখানে সবাই অত্যন্ত ঘিঞ্জি অবস্থায় রয়েছে। অনেক পাড়ায় জনসংখ্যা দ্বিগুণ নয়, বরং তিন গুণ বেড়েছে। কারণ, কেউই তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতে পারছে না। আমরা জাইতুন, শুজাইয়া ও তুফাহ এলাকার কথা বলছি।’
হানি মাহমুদ আরও জানান, ‘মাত্র কয়েক মিনিট আগে ড্রোন ও গুঞ্জনের শব্দ কিছুটা কমেছে। কিন্তু গত রাত ও গতকাল সারা দিনই এই শব্দ অব্যাহত ছিল। এখান থেকে স্পষ্ট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।’
সোমবার গাজার দক্ষিণাঞ্চলেও নতুন করে তীব্র হামলা শুরু হয়। বিশেষ করে রাফাহ ও খান ইউনিস শহরের উত্তর ও পূর্ব দিকে কামান হামলা ও হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। এর আগের দিন রোববারও ইসরায়েল গাজার এমন এলাকাগুলোতে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো সরাসরি তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেই। চিকিৎসা সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, খান ইউনিসে পৃথক হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
মধ্য গাজার মাঘাজি ক্যাম্পে আল-শানা পরিবারের মালিকানাধীন একটি পাঁচতলা ভবন ধসে পড়েছে। ভবনটি ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল। সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছেন। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার তথ্যমতে, এ ঘটনায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যেই রাফাহ সীমান্ত পারাপার পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে আশা ও গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকের কাছে এই পারাপার একটি জীবনরক্ষাকারী পথ হতে পারে, যার মাধ্যমে অসুস্থ ও আহতরা চিকিৎসার সুযোগ পাবেন, বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলো পুনর্মিলিত হতে পারবে এবং উপত্যকায় প্রবেশ বা বের হওয়ার একটি বিরল সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে ভীতিও কম নয়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই সীমান্ত পারাপার সাময়িক ও সীমিত হতে পারে, যা কেবল অল্প কয়েকজনের উপকারে আসবে। আবার কেউ কেউ এটিকে ‘একমুখী বহির্গমন’ পথে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন, যা স্থায়ীভাবে বিতাড়নের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং যারা চলে যাবে, তারা আর ফিরে আসতে পারবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
হানি মাহমুদ বলেন, ‘গত কয়েক দিনের শিরোনামে যা পড়েছি, বাস্তবে তার বাইরে এখনো তেমন কিছু ঘটেনি। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যে রাফাহ সীমান্ত খুলে দেওয়া হতে পারে। তবে আমাদের জানা মতে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এটিকে কেবল একমুখী প্রস্থানের পথ হিসেবে ব্যবহারের জন্য চাপ দিচ্ছে।’
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ৩৮৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ২৬৪ জন আহত হয়েছেন। তিন মাস আগে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও নিহত হয়েছেন অন্তত ৪২০ জন।
জাতিসংঘ ও মাঠপর্যায়ে কর্মরত সংস্থাগুলোর বারবার আহ্বান সত্ত্বেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজা সীমান্তে জমা থাকা বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা আটকে রেখেছে। যদিও ইসরায়েলের দাবি, উপত্যকায় ত্রাণের কোনো ঘাটতি নেই।






