প্রায় ১৩ বছর আগে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন আকরাম। আশ্রয়দাতাকেই বাবা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। পেয়েছিলেন একজন মাও। বেশ মানিয়ে নিয়েছিলেন মা-বাবার সঙ্গে।
সেই বাবার মৃত্যুর পর আবার শূন্যতার অনুভব। জন্মদাতা মা-বাবাসহ স্বজনদের জন্য মন ব্যাকুল।
মা-বাবার খোঁজ দিতে পরিচিত এক শিক্ষকের সাহায্য চান মো. আকরাম মিয়া। ছুটে গেলেন গ্রামে।
কিছুটা অপরিচিত মনে হলো চারপাশ। এদিক-ওদিক ঘুরলেন। কবরস্থান দেখে স্মৃতিচারণা করলেন। হঠাৎ দেখা এক স্বজনের সঙ্গে।
একে অপরকে কিছুটা চিনতে পেরে আলাপচারিতা। বেরিয়ে আসে অনেক কথা।
এবার বাড়ি যাওয়ার পালা। আকরামকে দেখার পর মা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। পরিচয় জেনেও বিশ্বাস হচ্ছিল না।
মুখে থাকা কাটা দাগ আর একটি দাঁতের ভাঙা অংশ দেখে আকরামকে শনাক্ত করলেন তিনি। এর পরই আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি।
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ এলাকার শাখাওয়াত মিয়ার ছেলে মো. আকরাম মিয়া। প্রায় ১৩ বছর আগে তিনি এক স্বজনের বাড়ি থেকে লুকিয়ে বেরিয়ে আসেন। এর পর থেকে থাকতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়। মেধা বিকাশ প্রি-ক্যাডেট স্কুলের পরিচালক শিক্ষক জহিরুল ইসলাম সাগরের পরিচয় হলে পারিবারিক অবস্থা জানান আকরাম। পরে জহিরুল ইসলামের সহযোগিতায় তিনি পরিবারকে খুঁজে পান।
পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাখাওয়াত মিয়ার সাত ছেলে ও এক মেয়ে। এর মধ্যে আকরামকে দিয়ে দেন সিলেটের এক স্বজনের কাছে। এ ঘটনা প্রায় ১৩ বছর আগের। আকরাম বয়স তখন ১৬-১৭ বছর। মানসিক অশান্তির কারণে তিনি ওই স্বজনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। চলে আসেন আখাউড়ায়। রবিউল মিয়া নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি আকরামকে কাছে টেনে নেন। থাকতেন পৌর এলাকার খড়মপুর বাইপাসের কাছে। রবিউলকে বাবা বলেই ডাকতেন আকরাম। রবিউলের স্ত্রীকে মা। পেশায় অটোরিকশাচালক আকরামকে বিয়েও করানো হয়। সম্প্রতি রবিউল মিয়া মারা যান। তার স্ত্রী চলে যান অন্যত্র। এ অবস্থায় চাঁনপুর গ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলে যান আকরাম। সেখানেই মাস দুয়েক ধরে আছেন তিনি।
কথা হলে শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম সাগর বলেন, আকরামের অটোরিকশা দিয়ে মাঝে মাঝে যাতায়াত করতাম। কথায় কথায় সে তার পারিবারিক অবস্থার কথা জানায়। সেই পালিত বাবার মৃত্যুর পর আকরাম একাকিত্ববোধ করতে থাকেন। তখন পরিবারকে খুঁজে দেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করি। গতকাল রবিবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে তাকে নিয়ে কমলগঞ্জ যাই। অনেক চেষ্টার পর তার বাড়ির খোঁজ পাওয়া যায়। মা-বাবা ও স্বজনরা আকরামকে পাওয়ার পর এক অন্য রকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আশপাশের লোকজনও ছুটে আসে। রাতেই আকরামের মা-বাবা আখাউড়াতে ছুটে আসেন। ছেলে কোথায় থাকে কিভাবে চলে সেটা দেখতে তাদের ছুটে আসা।
আকরাম মিয়া বলেন, আমার যে কি খুশি লাগতেছে তা বলে বোঝাতে পারব না। আমাকে দেখতে মা-বাবা, ভাই-বোনসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন আসতেছেন।
পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার পেছনে তিনি জহিরুল ইসলাম সাগরের অবদান উল্লেখ করেন।
আকরামের মা জরিনা বেগম বলেন, দিনের পর দিন বছরের পর বছর ছেলেকে খুঁজেছি। এমনকি আখাউড়াতেও খোঁজা হয়। হঠাৎ করে ছেলেকে এভাবে পেয়ে যাব কল্পনাও করিনি। তাকে দেখে প্রথম তো অবাকই হয়েছি। বিশ্বাসই হচ্ছিল না আমার।






