রাজধানী

চাঁদাবাজি দখলদারিত্ব ও সাংবাদিককে হুমকি ব্যানার বদল, চরিত্র অপরিবর্তিত : স্বৈরাচারের দোসরদের আশ্রয়ে বিএনপির রাজনীতি—উত্তাল ঢাকা–১৪

স্বৈরাচারমুক্ত দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে, সাবেক স্বৈরাচার সরকারের চিহ্নিত দোসর ও একাধিক মামলার আসামিদের সঙ্গেই ঢাকা–১৪ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরা!

আসন্ন জাতীয় ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোরেশোরে প্রচার-প্রচারণা। তবে এই প্রচারণায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন ও প্রশ্নবিদ্ধ চিত্র।

ঢাকা–১৪ আসনের একসময় ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার সরকারের চিহ্নিত দোসর হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের এখন দেখা যাচ্ছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কি আদৌ আদর্শিক পরিবর্তন—নাকি’ শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ পুরনো কৌশল? নাকি অতীতের অপকর্ম ঢেকে রেখে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর অপচেষ্টা?
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা ও ক্ষোভ। প্রশ্ন উঠছে—যারা গত দিনে স্বৈরাচারী শাসনের সহায়ক হিসেবে পরিচিত ছিল, তারা আজ কীভাবে গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকারের পক্ষে কথা বলার দাবি করে? তাদের এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন কি বিশ্বাসযোগ্য, নাকি এটি শুধুই সময়োপযোগী রাজনৈতিক আত্মরক্ষা?
সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তিদের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

বিশেষ করে রাজধানীর ঢাকা–১৪ আসন এখন চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, নারী নির্যাতন, পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হুমকির অভিযোগে আতঙ্ক ও ক্ষোভে ফুঁসছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার সরকারের সময় আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা কুখ্যাত ভূমিদস্যু ও অপরাধী চক্র রাজনৈতিক ব্যানার পরিবর্তন করে এখন বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় প্রকাশ্য দাপট দেখাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউন্দিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও চিহ্নিত ভূমিদস্যু সাইফুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সোহরাব হোসেন, শফি হাজী, লিটন কবিরাজ, আব্দুল হাই দেওয়ান ও আবু তালেব মেম্বার—এই চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, জমি দখল, নারী নির্যাতন, অস্ত্র ও মাদক সংশ্লিষ্টতা এবং একাধিক সহিংস ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ার কারণে এসব অভিযোগ বারবার ধামাচাপা পড়েছে।

ঢাকা–১৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সমন্বয়ক ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলির নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম সারিতে এসব বিতর্কিত ব্যক্তিদের সক্রিয় উপস্থিতি স্থানীয় রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

তৃণমূল বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বলেছেন, স্বৈরাচার আমলে অপরাধে জড়িতদের পুনর্বাসন দলের আদর্শ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় সোহরাব হোসেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিকাশ পরিবহনের প্রকৃত মালিক আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাকে হয়রানিতে ফেলেন।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি দখলে নিয়ে নিজেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পরিচয় দিয়ে পরিবহন সেক্টরে একটি সংগঠিত চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

বিকাশ পরিবহনের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, এমডি পরিচয়ে প্রতিদিন ‘জিপি’ নামে নিয়মিত অর্থ আদায় ছিল একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া।

অভিযোগ রয়েছে, সাইফুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসী বলয় হিসেবে পরিচিত এই চক্র কাউন্দিয়া ইউনিয়নের অসহায় মানুষের বসতভিটা ও জমি দখল, সরকারি জমি আত্মসাৎ, ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দকৃত জমি দখল, তুরাগ নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং জোরপূর্বক নিচু জমি ভরাট করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে আসছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা বাড়ি নির্মাণ শুরু করলেই চাঁদা দাবি করা হতো।

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি, মারধর এমনকি এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটেছে।
এক ভুক্তভোগী বলেন, “প্রভাবশালীদের নাম শুনলেই সবাই ভয় পেত। আইনের আশ্রয় নিতে গেলে উল্টো চাপ আসত।”
নারী নির্যাতনের অভিযোগও এই চক্রের বিরুদ্ধে গুরুতরভাবে সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব ঘটনা দীর্ঘদিন আড়ালে রাখা হয়েছে।
এক মানবাধিকার কর্মী বলেন,
“রাজনৈতিক আশ্রয়ে নারী নির্যাতনের অভিযোগ চাপা পড়া রাষ্ট্র ও মানবাধিকারের জন্য ভয়ংকর বার্তা।”

এসব অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একজন সাংবাদিক নয়—সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
এ বিষয়ে প্রতিবেদক বলেন, “এই চক্র যে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার সরকারের সময় আওয়ামী লীগের সক্রিয় দোসর হিসেবে কাজ করেছে, সে বিষয়ে আমার কাছে শতভাগ নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথিপত্র রয়েছে।

অভিযুক্তদের নামে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার কাগজপত্র দৈনিক ‘আমাদের সমাচার’ কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পারিবারিক ও সম্পদসংক্রান্ত বিরোধে তারা নিজের আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও মামলা করতে দ্বিধা করেনি—এমন গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে।”

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“কারও বিরুদ্ধে যদি একাধিক মামলা ও সংগঠিত অপরাধের তথ্য থাকে, রাজনৈতিক পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র–জনতার আন্দোলনের পর স্বৈরাচার সরকারের পতন হলেও এই চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

আগে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায়, এখন বিএনপির ব্যানারে একই ধরনের অপকর্ম অব্যাহত রয়েছে—এটাই ঢাকা–১৪-এর মানুষের আতঙ্ক।

এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে সোহরাব হোসেন, শফি হাজী, লিটন কবিরাজ, আব্দুল হাই দেওয়ান ও আবু তালেব মেম্বারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

ঢাকা–১৪-এর সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই— অপরাধীচক্রের দখলে থাকা রাজনীতি থেকে কবে মুক্তি পাবে এলাকা, আর কবে নিশ্চিত হবে আইনের শাসন ও মানুষের নিরাপত্তা?

নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply