ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি ফুটপাত, ব্যস্ত মোড় কিংবা জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় হকারদের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়। অথচ দুঃখজনকভাবে এই হকার পেশাটিকে আমরা বরাবরই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে আসছি। বাস্তবতা হলো—হকাররা শুধু রাস্তার পাশে বসে পণ্য বিক্রি করেন না, তারা এই শহরের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে নীরবে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

ঢাকা শহরে বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ দরিদ্র এবং একটি বড় অংশ নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। গৃহকর্মী, রিকশাচালক, গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মী, দোকান কর্মচারী ও নির্মাণশ্রমিক—এই মানুষগুলোর শ্রমেই ঢাকা শহর সচল। কিন্তু মাসিক ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকার সীমিত আয়ে তারা আধুনিক শপিংমলে কেনাকাটা করতে পারেন না। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও স্বল্পমূল্যের পোশাকের জন্য তাদের ভরসা হকাররাই। বাস্তবতা তাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—ঢাকা শহরে হকারদের প্রয়োজন কতটা গভীর।
পলিসি কর্মকর্তা, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিয়িং বাংলাদেশের তালুকদার রিফাত পাশা বলেন
হকার পেশাকে ক্ষুদ্র ব্যবসা বলা যায়। এই পেশায় প্রবেশ করতে বড় পুঁজি, বিশেষ দক্ষতা কিংবা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। ফলে বেকারত্ব হ্রাসে হকাররা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার হকারদের ৫২ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ জীবিকার জন্য এই পেশার ওপর নির্ভরশীল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রায় পাঁচ লক্ষ হকার রয়েছেন। এ বিপুল সংখ্যক হকারকে যদি একটি সুষ্ঠু লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় আনা যেত, তাহলে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, মাসিক মাত্র ৫০০ টাকা হারে লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করলে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন সম্ভব। অথচ পরিকল্পনার অভাবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, হকাররা প্রতিনিয়ত অবৈধ চাঁদাবাজি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি এবং উচ্ছেদ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পত্রিকা ও গবেষণায় উঠে এসেছে—কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না রেখেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হওয়ায় হাজারো পরিবার হঠাৎ করে জীবিকা হারাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই মানবিক বা টেকসই সমাধান হতে পারে না।
এ অবস্থায় উচ্ছেদের আগে সরকারের উচিত হকারদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা। এই নীতিমালার মাধ্যমে হকারদের আইনগত স্বীকৃতি, জীবিকার নিরাপত্তা এবং হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতায় উপযোগী একটি নীতিমালা এখন সময়ের দাবি।
এছাড়া সিটি করপোরেশনের অধীনে হকার বিষয়ক একটি পৃথক বিভাগ গঠন করা যেতে পারে। এই বিভাগ লাইসেন্স প্রদান, নির্ধারিত স্থানে বসার ব্যবস্থা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা তদারকি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরির দায়িত্ব পালন করবে। এর ফলে একদিকে যেমন শহরের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, অন্যদিকে হকাররাও সম্মানজনকভাবে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন।
বিশ্বের উন্নত শহর—প্যারিস, লন্ডন, রোম, বার্লিন কিংবা এশিয়ার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও প্রতিবেশী ভারত—সব দেশেই হকাররা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবসা করছে এবং সরকার রাজস্ব আয় করছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই উদাহরণ অনুসরণ করতে পারে।
হকাররা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন। তাদের এই অবদান অস্বীকার নয়, বরং স্বীকৃতি দেওয়াই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই উচ্ছেদ নয়—প্রথমে রুজি-রুটির বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, মানবিক ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই হকার সমস্যার টেকসই সমাধান করতে হবে।
উচ্ছেদের আগে ব্যবস্থা—এটাই হোক রাষ্ট্রের মানবিক সিদ্ধান্ত।






