তৃণমূল পর্যায়ে জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালী করতে হলে স্থানীয় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। টপ-ডাউন পদ্ধতির কারণে জনগণের মতামত ও চাহিদা প্রতিফলিত না হওয়ায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবেশগত ন্যায়বিচার ও জেন্ডার অন্তর্ভুক্তি ব্যাহত হচ্ছে। তাই বটম-আপ এপ্রোচ বাস্তবায়ন, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং জেন্ডারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন বক্তারা।
সোমবার ঢাকার সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় পর্যায়ের নাগরিক সংগঠন ওয়েভ ফাউন্ডেশন আয়োজিত দিনব্যাপী ‘জলবায়ু সুশাসন সিম্পোজিয়াম’-এ এসব কথা বলা হয়। সিম্পোজিয়ামটি ওয়েভ ফাউন্ডেশন ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (WRI)-এর সহযোগিতায় বাস্তবায়িত Strengthening Climate Governance with Grassroots Participation in Bangladesh (SCGGP) প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়।
প্রকল্পটি বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার ৪টি উপজেলা ও ৩২টি ইউনিয়নে তৃণমূল জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বিভিন্ন কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। সিম্পোজিয়ামে উপস্থাপিত সামাজিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জলবায়ু সুশাসন জোরদারে তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন গ্যাপ চিহ্নিত করা হয়। এতে জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় উন্নয়ন, নীতিমালা বাস্তবায়ন, জনঅংশগ্রহণ ও জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য সংক্রান্ত সমস্যা তুলে ধরে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বেশকিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।
দিনের শুরুতে ‘স্থানীয় অংশীদারিত্ব উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (আইন অধিশাখা) শাহানারা ইয়াসমিন লিলি। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চ (সিএসআর)-এর গবেষণা পরিচালক আহমেদ বোরহান। প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও অর্জন তুলে ধরেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক নাসিফা আলী সূচনা এবং সঞ্চালনা করেন উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমা।
প্যানেল আলোচনায় শাহানারা ইয়াসমিন লিলি বলেন, গ্রামাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে, তবে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সহকারী প্রকল্প পরিচালক নাহীদ সুলতানা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় সবুজায়ন ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সিআরপিডির প্রধান নির্বাহী মো. শামছুদ্দোহা বলেন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকায় বাজেটের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। এজন্য ইউনিয়ন পরিষদকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আরও সক্ষম করে তুলতে হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শিলা রাণী দাস বলেন, উপকূলীয় অঞ্চল দুর্যোগপ্রবণ হলেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন করেছে।
সভাপতির বক্তব্যে মহসিন আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম হলেও দায়ী দেশগুলো তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। সীমিত বাজেটের সঠিক ব্যবহার, ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা ও মনিটরিং জোরদার করা গেলে জাতীয় পর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সিম্পোজিয়ামের দ্বিতীয় পর্বে ‘জলবায়ু অভিবাসন ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার রায়হান ফিরদৌস বলেন, ‘জলবায়ু অভিবাসন’ বিষয়টি এখনো আইনি স্বীকৃতি পায়নি, যা দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ওয়াটার ডট ওআরজি-দক্ষিণ এশিয়ার পোর্টফোলিও লিড আবু আসলাম বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন। আলোচনায় আরও অংশ নেন হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ফারহানা আফরোজ, ব্লাস্টের ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যাডভাইজার আহমাদ ইব্রাহীম এবং বরগুনা ও পটুয়াখালীর ইউপি চেয়ারম্যান প্রতিনিধিরা।
সিম্পোজিয়ামে উপস্থাপিত সুপারিশে নিয়মিত ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ওয়ার্ড সভা আয়োজন, উন্মুক্ত বাজেট সভা চালু, বটম-আপ এপ্রোচ বাস্তবায়ন, ত্রাণ ও সহায়তায় স্বচ্ছতা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক নীতিমালা এবং কার্যকর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। দিনব্যাপী এ আয়োজনের শেষাংশে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কার্যক্রমের প্রদর্শনী এবং সমগীত সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গনের পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।






