শিক্ষক নিয়োগ, টেন্ডার ও মালামাল বিক্রিতে ভয়াবহ অনিয়ম; ক্ষমতার অপব্যবহারে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গভীর সংকটে। সাবেক অ্যাডহক কমিটির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে প্রতিষ্ঠানটিতে কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত ১৬ বছরে স্বৈরাচার সরকারের সময় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও সরকার পতনের পর এবং আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসার পর মনিপুর স্কুলে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং আগের তুলনায় বর্তমানে অনিয়ম ও দুর্নীতি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ৩০ অক্টোবরের পর মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যাডহক কমিটির দায়িত্ব জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হাতে যাওয়ার কথা থাকলেও মনিপুর স্কুলে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিভাবকরা জানান, আগের কমিটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এখনও নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এই বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র বিদ্যালয়টির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিভাবক ও শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, সদ্য সাবেক অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তাহমিনা আক্তার এবং অভিভাবক প্রতিনিধি শাকিল মোল্লার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠে নানা অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকদের প্রাপ্য বিএড স্কেল, উচ্চতর গ্রেড ও বদলি সুবিধা দেওয়ার নামে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এক শাখা থেকে অন্য শাখায় বদলির ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলেও দাবি করেছেন একাধিক শিক্ষক।
এছাড়া প্রায় ২০টি শিক্ষক ও ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। অভিভাবকদের প্রতিবাদের মুখে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হয়।
টেন্ডার বাণিজ্য নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষার খাতা ও কাগজ কেনার ক্ষেত্রে টেন্ডার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিদ্যালয়কে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলা হয় বলে অভিযোগ।
৪০ লাখ টাকার কাগজ কেনার দরপত্র প্রথমে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেখানো হয়, যা পরে ১ কোটি টাকায় নামানো হলেও বাজারমূল্যের তুলনায় বিপুল অঙ্ক বেশি দিয়ে ক্রয় করা হয়েছে। পুরনো মালামাল বিক্রির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
৫৫ লাখ টাকায় বিক্রি হওয়া মালামালের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা পড়ে মাত্র ১১ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক ঠিকাদারি ও সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে চেকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিল আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়ে এই অর্থ আদায় করা হয় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
শিক্ষকরা আরও অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, ‘আওয়ামী লীগ কিংবা জামায়াত’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়া হতো।
অন্যদিকে, অভিভাবক প্রতিনিধি শাকিল মোল্লার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পদ ধরে রেখে প্রভাব বিস্তার করছেন। মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও সচেতন মহল নিরপেক্ষ ও গোপন তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।
তারা বলেছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। উক্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক সভাপতি তাহমিনা আক্তার ও অভিভাবক প্রতিনিধি শাকিল মোল্লার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।






