রাজধানী

ফ্লেভারের আড়ালে নিকোটিন সাম্রাজ্য, ২৫ বছরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে

বাংলাদেশে ফ্লেভারযুক্ত ও বিদেশি সিগারেটের বিস্তার দিনে দিনে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আপেল, স্ট্রবেরি, চকলেটসহ বিভিন্ন ফ্লেভারের সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে তরুণ-তরুণীরা দ্রুত নিকোটিনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এই ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট সাধারণ সিগারেটের তুলনায় বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর এবং দ্রুত নেশা নির্ভরতা তৈরি করে।

তরুণদের নিশানায় ফ্লেভার সিগারেট
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তামাক কোম্পানিগুলো নানা কৌশল প্রয়োগ করছে। ক্যাম্পাসে নারী এজেন্ট নিয়োগ, ফ্রি স্যাম্পল বিতরণ, গিফট আইটেম সরবরাহ ও ইনডোর কনসার্ট আয়োজনের মাধ্যমে নতুন ভোক্তা তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, আইন থাকা সত্ত্বেও এসব কোম্পানির মার্কেটিং কার্যক্রম বন্ধ করতে না পারায় তরুণ সমাজ আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
বাংলাদেশে বাজারে থাকা অধিকাংশ ফ্লেভারযুক্ত সিগারেটই বিদেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই সিগারেটগুলোর প্যাকেটে বাংলা সতর্কবাণী না থাকায় সেগুলো সরাসরি আইন লঙ্ঘন করছে।
বাংলাদেশে সিগারেট কোম্পানি কতটি
সরকারি ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেশে বড় আকারের সিগারেট উৎপাদনকারী কোম্পানি রয়েছে মাত্র ৩টি—
১) ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (BATB)
২) জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (JTI)
৩) ইউনাইটেড ঢাকা টোব্যাকো
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক ক্ষুদ্র শিল্পে বিড়ি, জর্দা, খৈনি ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কর ফাঁকির দিক থেকে বড় তিন কোম্পানির বাজার-প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
বার্ষিক আয়—যা কাগজে এক, বাস্তবে আরেক
বড় তিন তামাক কোম্পানির বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ আনুমানিক ৫৫,০০০ থেকে ৬৫,০০০ কোটি টাকা।
তবে কর ও ভ্যাট ফাঁকি, অবৈধ সিগারেট বিক্রি, নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার এবং বিদেশি ব্র্যান্ডের চোরাচালানের কারণে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
এ অঙ্ক দেশীয় স্বাস্থ্য বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমান।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেই কেন
বাংলাদেশ ২০০৫ সালে প্রথম তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন করে এবং ২০১৩ সালে সংশোধনী আনে। তবুও এখনও সিগারেট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বড় কোনো মামলা বা কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞরা এর কয়েকটি স্পষ্ট কারণ তুলে ধরছেন—
১. শক্তিশালী লবিইং
আন্তর্জাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর লবিইং ক্ষমতা এতটাই প্রভাবশালী যে নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রয়োগে চাপ সৃষ্টি হয়।
২. আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই
ধূমপান নিষিদ্ধ এলাকা, সতর্কবাণী বাধ্যতামূলক, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ—সব আইন থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল।
৩. কর কাঠামোর জটিলতা
বহুস্তরবিশিষ্ট সিগারেট কর কাঠামো কোম্পানিগুলোকে কর ফাঁকির সুযোগ দেয়। সস্তা দামের সিগারেট বাজারে আনার মাধ্যমে তরুণরা সহজেই এ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
৪. বিদেশি ব্র্যান্ডের অবাধ প্রবেশ
বাংলাদেশে বিদেশি সিগারেটের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট শক্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে অনুমোদনবিহীন অসংখ্য বিদেশি ব্র্যান্ড যত্রতত্র বিক্রি হচ্ছে
বিদেশে নিষিদ্ধ, বাংলাদেশে কেন অবাধ?
ইউরোপের বহু দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশেই ফ্লেভার সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে এ বিষয়ে কঠোরতার মাত্রা বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে এখনও বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি,
তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে
ফ্লেভারযুক্ত সিগারেটের নেশা অল্প বয়সেই ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখগহ্বরের ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাক, অ্যাজমা, নিউমোনিয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন তরুণ এসব সিগারেটে আসক্ত হয়ে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা নিচের সুপারিশগুলো গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন
ফ্লেভার সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা
বিদেশি ব্র্যান্ডের বিক্রিতে কঠোর পারমিট ব্যবস্থা
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তামাক প্রচারণা ও মার্কেটিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন
তামাক কর কাঠামো সরল ও কঠোর করা
গণমাধ্যমকে তামাকবিরোধী প্রচারণায় আরও সম্পৃক্ত কর
ফ্লেভারের আড়ালে নিকোটিন সাম্রাজ্য দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং বিদেশি সিগারেট নিয়ন্ত্রণ ছাড়া তরুণ প্রজন্মকে এই নেশার হাত থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে এখনই শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।

Leave a Reply