হাওর জনপদে এখন চলছে ধান কাটা ও মাড়াই এর মওসুম। হাওর অঞ্চলের গ্রামগুলোয় এখন নতুন ধানের গন্ধ। চারিদিকে ধান কাটা আর ধান মাড়াইয়ের দৃশ্য। কোনো কোনো হাওরে এখনও কাচা ধান দেখা গেলেও পেকে গেছে অধিকাংশ হাওরের ধান ৷ কৃষকদের ধারণা বৈশাখ মাসের পুরোটা সময় লাগবে সবগুলো জমির ধান তুলতে।
এবার হাওরে আশানুরূপ ধানের ফলন হয়েছে, জানালেন কৃষকরা। কেউ কেউ বলছেন, বাম্পার ফলন। তবে তারা পাচ্ছেন না ধানের ন্যায্য দাম । সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় সুযোগ নিচ্ছে সিন্ডিকেট । পাইকারি পর্যায়ে ধানের দাম কম বলে জানিয়েছেন কৃষকরা । এত ধান মজুদের জায়গা নেই কৃষকদের। তাই অগত্যা কম দামেই পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ধান। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কারণেই ধানের দাম কম বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। সরকারের নির্ধারিত দরের প্রায় অর্ধেক দামে ধান বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা ।
কিশোরগঞ্জ- নিকলীর বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ জমির ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে৷ কিছু জমির ধান আধাপাকা রয়েছে। কোনো কোনো হাওরে হারভেষ্টার মেশিনে কাটা হচ্ছে ধান। কোথাও ক্ষেতমজুররা হাতে ধান কাটছেন। তবে মেশিনের ব্যবহারই বেশি চোখে পড়েছে।
বাজিতপুর উপজেলার হুমাইপুর হাওরে দেখা যায়, মেশিনের মাধ্যমে কাটা ধান রাস্তার পাশে এবং অস্থায়ী খলার মধ্যে রাখা হচ্ছে৷ সেখান থেকেই কেউ বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার কেউ অটোরিকশা, ট্রলি করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন৷
হুমাইপুর গ্রামের কৃষক জমির মিয়ার অভিযোগ, ধান করে তারা লাভবান হচ্ছেন না। ৮ শ থেকে ৯ শ টাকা মণে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে৷ অথচ উৎপাদন খরচও অনেকটা একইরকম ।
জমির বলেন, মহাজনের পাওনা টাকা দিতে হবে, যত দেরি, সুদ তত বাড়বে । এজন্য দ্রুত ধান বিক্রি করতে হবে। তার সেই সুযোগ নিচ্ছে সিন্ডিকেট । ফলে কম দামেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ।
আমার মতো অনেকেই টাকা ধার নিয়ে জমি লাগিয়েছে৷ বাম্পার ফলন হয়েছে । ভালো দামে ধান বিক্রি করতে পারলে লাভবান হতে পারতাম৷ কিন্তু তা হচ্ছে না, আকুতি এই কৃষকের ।
ধান ক্রয় করা ব্যাপারী ইব্রাহিম হোসেন জানালেন , ৮ শ ৩০ টাকা মণে ধান কিনছেন ৷ কৃষকরা বিক্রি করছে বলেই তো আমরা কিনছি, বলেন ইব্রাহিম। এই ধান ভৈরব মোকাম হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাবে, জানালেন তিনি ।
একি এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান হবি বলেন, নতুন ধান নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন থাকে । ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, মেয়ে বিয়ে দেয়ার খরচ এই ধান থেকেই। বর্ষায় আমরা মাছ শিকার করি আর শুকনো সময় ধান আমাদের অর্থকরী ফসল৷ কিন্তু ন্যায্য দাম মেলে না।
সরকার সঠিক দাম নির্ধারণ করে দিলে কৃষক ও কৃষি বেঁচে থাকবে, বলেন হাবিবুর।
কৃষকরা বলছেন, খরচ ও ঋণ মেটাতে অনেক চাষি ধান ঘরে না তুলেই বিক্রি করে দিচ্ছেন। মনপ্রতি ৮২০ থেকে ৯০০ টাকা দর পাচ্ছেন । অথচ এক মণ বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচও পড়ে সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত। তাই ফলন ভালো হলেও খুব একটা খুশি হতে পারছেন না কৃষকরা।
সরকার চলতি বছরের জন্য ধানের ক্রয়মূল্য ১৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে কৃষক অন্তত ৬০০ টাকা (প্রায় অর্ধেক) কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়। এর মাঝে শুধু হাওরেই ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। যেখান থেকে উৎপাদিত চালের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৮৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
গত বছর ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১২০০ টাকা প্রতি মণ। তবে এবার তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৪৪০ টাকা প্রতিমণ। কেজিপ্রতি যার দাম ৩৬ টাকা। সরকার এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে ৩৯ টাকা কেজি দরে ধান ও ৪৮ টাকা কেজি দরে চাল সংগ্রহ করবে বলে জানা গেছে।
কৃষি শ্রমিকের সংকট কাটাতে হাওরে ২২০টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিন ধান কাটার কাজ করছে। এছাড়া প্রতিদিনই বাহিরের জেলা থেকে হার্ভেস্টার মেশিন আসছে, জানালেন এই কর্মকর্তা ।
কিশোরগঞ্জের হাওরে এবার বোরো ধানের ফলন ভাল হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার হেক্টরপ্রতি অন্তত ১০ মণ ধান বেশি হচ্ছে বলে ধারণা কৃষি বিভাগের। অষ্টগ্রামের সব হাওরের হিসাব একই। তাছাড়া , ধানে চিটা হয়নি। এখন পুরোদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান ৮০ ভাগ পাকা হয়ে গেলে কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। এতে ধান কাটায় গতি এসেছে।
অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অভিজিৎ সরকার বলেন, ধান কাটার সার্বিক বিষয় নিয়ে এখন পর্যন্ত তিনি সন্তুষ্ট। ফলন হেক্টরপ্রতি ১০ থেকে ১২ মণ বেশি হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভালো করে মাঠের ফলন গোলায় তুলতে পারলে এই খুশি মহাখুশির মাত্রা পাবে।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ভালো ফলনের খুশি ধরে রাখতে ধান ৮০ ভাগ পাকা মাত্র কেটে ফেলার আহ্বান জানাচ্ছি । কারণ, ঝড় কিংবা শিলাবৃষ্টিতে হাওরের পাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সব সময় থেকেই যায়।



