গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন (এলএসটিডি) প্রকল্পের আওতায় ধান চাষে বিষ প্রয়োগ ছাড়াই ক্ষতিকর পোকা দমনে “ইকোলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং” প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ আশার নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে। পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে শতভাগ সফলতা অর্জন করেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্রির তথ্যমতে, ধানক্ষেতের আইলে গাঁদা, সূর্যমুখী, কসমসসহ বিভিন্ন ফুলের গাছ এবং তিলের মতো উদ্ভিদ রোপণের মাধ্যমে উপকারী পোকার আবাসস্থল তৈরি করা হয়। এসব ফুলের মধু ও পরাগে আকৃষ্ট হয়ে লেডিবার্ড বিটল, মাকড়সা ও পরজীবী বোলতার মতো উপকারী পোকা মাঠে আসে এবং ক্ষতিকর পোকার ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করে। ফলে জমিতে রাসায়নিক কীটনাশকের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ব্রির কীটতত্ত্ব বিভাগ জানিয়েছে, দেশে ধানের প্রায় ২৩২ প্রজাতির ক্ষতিকর পোকামাকড় শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০ থেকে ৩৩ প্রজাতি ফলনের জন্য মারাত্মক হুমকি। এসব পোকার আক্রমণে বোরো মৌসুমে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ, আউশে ২৪ শতাংশ এবং আমনে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত ফলনহানি ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটি, পানি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ বাস্তবতায় প্রকৃতির ভারসাম্যকে কাজে লাগিয়ে পোকা দমনের এই প্রযুক্তি কৃষিতে টেকসই সমাধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্রির গবেষকরা জানান, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক মাঠপর্যায়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ইকোলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি ব্যবহারে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে, কীটনাশক ব্যবহার কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং ধানের ফলন বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ কমে কৃষকের অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে এবং জমির স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হচ্ছে।
এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশের ১৫টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে অত্যন্ত ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তিনি জানান, “আমরা চাই কৃষক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাষাবাদ করুক। নিরাপদ খাদ্য ও সুস্থ জীবনের জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকল্প নেই।”
মাঠপর্যায়ের কৃষকরাও এই প্রযুক্তিতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, আগে পোকা দমনে যে পরিমাণ খরচ হতো, এখন তা অনেক কমেছে। একই সঙ্গে ধানের ফলনও ভালো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তি দেশে বিষমুক্ত ধান উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। “প্রকৃতির সাথে মিলেই হোক কৃষির উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য সুস্থ জীবন”—এই বার্তাকেই সামনে রেখে প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে ব্রির এলএসটিডি প্রকল্প।





