রাজধানীর দারুস সালাম থানাধীন মাজার রোড এলাকায় অন্যের প্রতিষ্ঠানকে নিজের দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় দেড়শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অভিনব প্রতারণায় ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির পার্টনারশিপ ব্যবসায় অর্থলগ্নি করানো ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে প্রায় অর্ধশত ভুক্তভোগীর কাছ থেকে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন বিশাল অঙ্কের এই টাকা। মাসের পর মাস ঘুরেও কাজ না হওয়ায় এবং টাকা ফেরত না পাওয়ায় ভুক্তভোগীরা থানা ও আদালতে মামলা ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ঢাকা-১৪ আসনের এমপি এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের প্রভাবে আরিফুলের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি কেউ। উল্টো, র্যাব-পুলিশ দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে এতদিন ভুক্তভোগীদের কোণঠাসা করে রেখেছিলেন এই যুবলীগ নেতা।
জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ধানমন্ডির বাসিন্দা কেএম শাহরিয়ার হক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র হত্যার
অভিযোগে মামলাসহ অন্য ভুক্তভোগীরা বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা করায় কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি ভোল পাল্টে ফের সামনে এসেছেন আরিফুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, মিরপুরের একজন যুবদল নেতার আশ্রয়ে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে আরিফুল ইসলাম। পাওনা টাকা ফিরে পেতে ৫ আগস্টের পর ভুক্তভোগীরা যৌথ বাহিনীর সহায়তায় আরিফুল ইসলামকে মিরপুরে আটক করেছিলেন। কিন্তু তার পক্ষ হয়ে ঢাকা মহানগর উত্তরের যুবদলের এক নেতার কারণে সে যাত্রায় বেঁচে যান। এখন দেড়শ কোটি টাকা হাতিয়েও তিনি প্রকাশ্যে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
এদিকে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে আওয়ামী লীগের দোসরদের সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে যুবদল নেতাকে গত ৬ সেপ্টেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের পক্ষ থেকে। যুবলীগ নেতা আরিফুলের বিষয়ে ওই যুবদল নেতা আমাদের সময়কে বলেন, আরিফুল যে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, বিষয়টি আমি জানতাম না। আর আমার মধ্যস্থতায় তাকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে, এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটি স্রেফ অপপ্রচার।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল রবিবার যুবলীগ নেতা আরিফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও ওপাশ থেকে সাড়া দেননি তিনি।
রাজধানীর শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা ভুক্তভোগী মো. ইসমাইল আমাদের সমাচার’কে জানান, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য বিবিএ সম্পন্ন করে স্বজনদের সহায়তায় নিজ উদ্যোগে ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। পূর্ব পরিচিতির সুবাদে যুবলীগ নেতা আরিফুলকে তিনি জানান, ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা হতে চান। মওকা পেয়ে ইসমাইলের পরিবারকে কেন্দ্র করে প্রতারনার ফাঁদ পাতেন আরিফুল। দারুস সালাম থানাধীন মাজার রোড এলাকায় জনৈক মাসুদ চৌধুরীর ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে জাহির করেন তিনি। এই প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায় আরিফুলের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দিলে ইসমাইল বিশ্বাস করে পার্টনারশিপ ব্যবস্যায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ইসমাইল ও তার পরিবারের কাছ থেকে দফায় দফায় প্রায় ৫৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন আরিফুল। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ে টেন্ডারে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশে বিনিয়োগের কথা বলেও ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা নেন তিনি। এ ছাড়া স্থানীয় এমপির মাধ্যমে মিরপুর কাঁচা বাজারের আড়ত ৫ বছরের জন্য ইজারা নেওয়ার কথা বলে ১২ লাখ, চায়না থেকে আসা কন্টেইনার শিপমেন্টে বিনিয়োগের কথা বলে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ইসমাইল জানতে পারেন সব ভুয়া।
একপর্যায়ে আরিফুলের কাছে সব টাকা ফেরত চাইলে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি আসতে থাকে ইসমাইলদের পরিবারে। যুবলীগ নেতা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের আগে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছিলেন না ভুক্তভোগী মো. ইসমাইল। খিলগাঁও বনশ্রীর বাসিন্দা ভুক্তভোগী আনিছুর রহমান জানান, আরিফুল ইসলাম ২০২২ সালে তার কাছে একটি এলিয়ন প্রাইভেটকার বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। গাড়িটি বিক্রির কথা বলে তার কাছ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা নেন। একপর্যায়ে গাড়ির যাবতীয় ডকুমেন্ট দেওয়ার কথা বলে দারুস সালাম থানাধীন কিয়াংসি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের সামনে কৌশলে চা খাওয়ার কথা বলে নামিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান আরিফুল। পরে টাকা ফেরত চাইলে আরিফুল তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হামলা চালান। টাকা হারিয়েও ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি এই ভুক্তভোগী।
এ ছাড়াও আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় আমাদের সমাচারে’র সঙ্গে। তাদের মধ্যে মো. ইসমাইলের ৭৬ লাখ টাকা, চকরিয়ার শিক্ষক মাহমুদুল্লাহ মোল্লার ২০ লাখ টাকা, চকরিয়ার ব্যবসায়ী জিয়া চৌধুরীর ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, আড়িয়ানের ২০ লাখ টাকা, মিথুনের ৩৩ লাখ টাকা, ভূমি অফিস ও প্রাইমারি স্কুলে সরকারি চাকরি দেওয়ার কথা বলে অন্তত ২১ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন যুবলীগ নেতা আরিফুল। শুধু তাই নয়, ১০ লাখ টাকা চেয়ে মারধরের অভিযোগ এনে আরিফুলের স্ত্রী তানজু আক্তার যৌতুকের মামলাও করেছিলেন আরিফুলের বিরুদ্ধে। কিন্তু ক্ষমতার কাছে অসহায় ছিলেন খোদ তার স্ত্রীও।






