সারাদেশ

যে খাদ্য গুদাম মানুষের অন্নের নিরাপত্তা দেবে, সেই গুদামই আজ অবহেলার করুণ প্রতিচ্ছবি!

রাষ্ট্রের খাদ্যভাণ্ডার কি অবহেলার হাতে জিম্মি? কুটি খাদ্য গুদামের চিত্রে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার সরকারি কুটি খাদ্য গুদাম, যেখানে সরকারের খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা হয় এবং যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত, সেই গুদামের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি অত্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। গুদামের প্রধান ফটক খোলা, খাদ্য সংরক্ষণাগারের প্রবেশপথও যথাযথভাবে নিরাপদ নয় এবং গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক ঘাটতি চোখে পড়ে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, গুদামে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে উপস্থিত পাওয়া যায়নি। গুদামে কেবল একজন নৈশপ্রহরীকে দেখা যায়। তাঁর কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি জানান, সহকারী খাদ্য কর্মকর্তা ইউসুফ সবুজ ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গেছেন। পরে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, গুদামের নিরাপত্তার জন্য স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খাদ্যশস্য সংরক্ষণের মতো স্পর্শকাতর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে যদি সার্বক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর না থাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত না হয়, তাহলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে কুটি এলাকার একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং এর বিনিময়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, একটি সরকারি খাদ্য গুদাম শুধু খাদ্যশস্য সংরক্ষণের স্থান নয়; এটি দুর্যোগ ও খাদ্য সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সেখানে নিরাপত্তার এমন দুর্বল চিত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তারা অবিলম্বে গুদামের নিরাপত্তা জোরদার, সিসিটিভি সচল, সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা উপস্থিতি নিশ্চিত এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার দাবি জানান।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি খাদ্য গুদামে সর্বক্ষণিক নিরাপত্তা, কার্যকর সিসিটিভি, নিয়মিত তদারকি এবং কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সরকারি খাদ্যশস্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সম্পদও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
দৈনিক আমাদের সমাচার অনলাইন মাল্টিমিডিয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, সরেজমিনে যে চিত্র দেখা গেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারি খাদ্য গুদামের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও তদারকির ঘাটতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। জনগণের স্বার্থে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করে নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করা, সিসিটিভি সচল করা, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply