রাজধানী

মৃতদের শান্তির ঠিকানায় অপরাধের আস্তানা!

বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মাদকসেবন, ছিনতাই, কবরের নামফলক চুরির অভিযোগ; সিটি কলোনিতে মাদকের আড্ডা ও জুয়ার আসর নিয়ে উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতায় জিয়ারতকারীরা
রাজধানীর মিরপুরের দারুসসালাম থানাধীন ঐতিহাসিক বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এবং কবরস্থান-সংলগ্ন সিটি কলোনি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বহিরাগত বখাটেদের অবাধ আনাগোনা এবং স্থানীয় কিছু কিশোর-যুবকের সম্পৃক্ততায় কবরস্থানের পবিত্র পরিবেশ, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কবরস্থানের বিভিন্ন স্থানে উদ্দেশ্যহীন আড্ডা, উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি, অশালীন ভাষার ব্যবহার, ধূমপান এবং প্রকাশ্যে মাদকসেবনের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, কবরের চিপায়-চাপায় বসেই একদল ব্যক্তি মাদকসেবন করে। এতে কবর জিয়ারতে আসা নারী, প্রবীণ ব্যক্তি, শিশু ও সাধারণ দর্শনার্থীরা চরম অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সন্ধ্যার পর অনেকেই নিরাপত্তার অভাবে কবরস্থানে প্রবেশ বা চলাচল এড়িয়ে চলেন বলে জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কবরস্থানের ভেতর দিয়ে চলাচলের পথকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে কবর জিয়ারতে আসা নারী, প্রবীণ ব্যক্তি ও সাধারণ দর্শনার্থীরা ছিনতাইকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। অনেকেই মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী হারানোর অভিযোগ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, কবর জিয়ারত করতে এসে তারা নানা ধরনের হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন, আবার অনেকেই কবরস্থানের ভেতরে মাদকসেবন, অশালীন আচরণ এবং বখাটেদের উৎপাত দেখে আতঙ্কিত হয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমি স্বজনের কবর জিয়ারত করতে এসেছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন যুবক আমাকে ঘিরে ভয়ভীতি দেখায়। পরে আমার কাছে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এরপর থেকে সন্ধ্যার পর আর কখনো এখানে আসার সাহস পাই না।”
আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, “কবরস্থানের মতো পবিত্র জায়গায় প্রকাশ্যে মাদকসেবন ও অশালীন আড্ডা চলতে দেখে আমরা চরমভাবে বিব্রত ও আতঙ্কিত হই। পরিবার-পরিজন নিয়ে কবর জিয়ারত করাও এখন ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়।”
অন্য এক নারী ভুক্তভোগী বলেন, “স্বজনের কবর জিয়ারত করতে এসে কিছু বখাটের কটূক্তি ও সন্দেহজনক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে আমরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হই।”
আরেকজন প্রবীণ ব্যক্তি অভিযোগ করেন, “অনেক কবরের নামফলক হারিয়ে যাওয়ায় স্বজনের কবর খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। কবরস্থানের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন অব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কবরস্থান-সংলগ্ন সিটি কলোনির নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নিয়মিত মাদকের আড্ডা ও জুয়ার আসর বসে। তাদের দাবি, সেখানে বসবাসরত সিটি কর্পোরেশনের কিছু কর্মচারী ও অন্যান্য ব্যক্তির সম্পৃক্ততায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বহিরাগতদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি কবরস্থানের পবিত্র পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন, মৃত ব্যক্তিদের কবরের নামফলক, সাইনবোর্ড ও বিভিন্ন স্থাপনা চুরির অভিযোগ। তাদের দাবি, অনেক কবরের পরিচিতি বহনকারী ফলক রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বজনরা কবর শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছেন। এ ধরনের ঘটনা মৃত ব্যক্তিদের প্রতি অসম্মান এবং কবরস্থানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার পরিচায়ক বলেও মন্তব্য করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, “বুদ্ধিজীবী কবরস্থান জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। এখানে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কবর রয়েছে। অথচ বর্তমানে কবরস্থানের পরিবেশ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, মানুষ নিরাপদে জিয়ারত করতেও ভয় পান।”
এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মতে, কবরস্থান শুধু মৃতদের দাফনের স্থান নয়; এটি মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত একটি পবিত্র স্থান। সেখানে মাদকসেবন, জুয়ার আসর, ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে তা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরই প্রতিফলন।
মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদে চলাচল এবং ধর্মীয় মর্যাদা বজায় রেখে স্বজনদের কবর জিয়ারত করার অধিকার রয়েছে। একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কবরস্থানে যদি দর্শনার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং সেখানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ ওঠে, তবে তা মানবাধিকার, জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত টহল, নজরদারি এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, ইসলামে কবরস্থানের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কবরস্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, মাদকসেবন, জুয়ার আসর, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা কিংবা মৃতদের কবরের ক্ষতি করা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা কবরস্থানের মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এবং Public Gambling Act, 1867-এর প্রযোজ্য ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। মাদকসেবন ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে আইন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। জুয়ার আসর পরিচালনা বা অংশগ্রহণের দায়ে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় চুরির অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী দণ্ডবিধির ডাকাতি ও রাহাজানিসংক্রান্ত প্রযোজ্য ধারায় দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া কবরের নামফলক, সাইনবোর্ড বা অন্যান্য স্থাপনা চুরি বা ক্ষতিসাধনের ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারা (চুরি), ৪২৭ ধারা (সম্পত্তির ক্ষতিসাধন) এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ধারায় মামলা দায়ের করা যেতে পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ড প্রদান করতে পারবেন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, কার্যকর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত পুলিশি টহল বৃদ্ধি এবং মাদক, জুয়া, ছিনতাই ও চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধে পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দৈনিক আমাদের সমাচার অনলাইন মাল্টিমিডিয়ার পক্ষ থেকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ, কবরস্থান পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং দারুসসালাম থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এই প্রতিবেদনে তাদের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
তবে উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে বর্ণিত মাদকসেবন, জুয়ার আসর, ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অপরাধসংক্রান্ত তথ্য স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বক্তব্য এবং প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দারুসসালাম থানার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply