সারাদেশ

কসবায় আলিম পরীক্ষায় নকলের মহোৎসব ভেস্তে দিল প্রশাসন: শিক্ষক কারাগারে, বহিষ্কার ৫ পরীক্ষার্থী

সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ল নকল সরবরাহের দৃশ্য; দায়িত্বরত দুই শিক্ষককে অব্যাহতি, পরীক্ষায় জিরো টলারেন্সের বার্তা প্রশাসনের।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় আলিম পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীদের নকল সরবরাহের দায়ে এক মাদরাসা শিক্ষককে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বরত দুই শিক্ষককে চলমান আলিম পরীক্ষার সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার উপজেলার কসবা মহিলা ডিগ্রি কলেজ আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে ইসলামের ইতিহাস পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
দণ্ডপ্রাপ্ত শিক্ষক হলেন আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের রানিখার এমদাদুল বারী মাদরাসার শিক্ষক মো. মনিরুল ইসলাম।
উপজেলা প্রশাসন ও কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকালে কসবা মহিলা ডিগ্রি কলেজে অনুষ্ঠিত আলিম পরীক্ষার ৩০১ নম্বর কক্ষে ইসলামের ইতিহাস পরীক্ষা চলাকালে পাঁচজন পরীক্ষার্থীকে নকল সরবরাহের অভিযোগ ওঠে শিক্ষক মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর কেন্দ্রে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে নকল সরবরাহের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত হয় উপজেলা প্রশাসন।
পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অভিযুক্ত শিক্ষক মনিরুল ইসলামকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে শিক্ষকের সহায়তায় নকল করার দায়ে পাঁচ পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া ৩০১ নম্বর কক্ষে দায়িত্বে থাকা আড়াইবাড়ী কামিল মাদরাসার শিক্ষক আফসানা আক্তার ও মো. বাকিবিল্লাহকে চলমান আলিম পরীক্ষার সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাওলানা আমিনুল ইসলাম বলেন, “কসবা মহিলা ডিগ্রি কলেজ আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নকল সরবরাহের বিষয়টি ধরা পড়ে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হলে তারা তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে কারাদণ্ড, পাঁচ পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার এবং দায়িত্বে থাকা দুই শিক্ষককে পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির বলেন, “পরীক্ষা চলাকালে ৩০১ নম্বর কক্ষে পরীক্ষার্থীদের নকল সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত শিক্ষককে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই কক্ষে দায়িত্বরত দুই শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং নকল করার দায়ে পাঁচ পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিউল ইসলাম বলেন, “মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। নকল সরবরাহের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় এনে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।”
শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, সততা ও সুশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা। সেখানে শিক্ষক নিজেই যদি নকলে সহায়তা করেন, তবে তা শুধু একটি অপরাধ নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তারা মনে করেন, পরীক্ষার হলে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি শিক্ষকদের জবাবদিহিতা আরও কঠোর করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।
সমাজ বিশেষজ্ঞদের মতে, নকলের সংস্কৃতি একটি জাতির মেধা ও নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীদের অসৎ পথে পরিচালিত করেন, তখন সমাজে ভুল বার্তা পৌঁছে যায়। তাই এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার পরিবেশ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত কয়েকজন অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানরা সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় অংশ নেয়। কেউ যদি অবৈধভাবে নকল করে ভালো ফল করার সুযোগ পায়, তাহলে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পরীক্ষার্থী বলেন, “যারা নিয়ম মেনে পরীক্ষা দেয়, তাদের জন্য নকল একটি বড় অন্যায়। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে পরীক্ষার পরিবেশ আরও সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

Leave a Reply