খোলা গুড়, পচা গুড় ও কাগজপত্রহীন ব্যবসার অভিযোগে চাঞ্চল্য
মাছি-পোকামাকড়ে আক্রান্ত পরিবেশে খাদ্য বিক্রির অভিযোগ; মালিকের দাবি ‘কোনো কাগজপত্র লাগে না’, তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি এলাকাবাসীর
রাজধানীর মিরপুরের দারুসসালাম থানাধীন বড়বাজারে অবস্থিত রঞ্জিত সাহার গুড়ের দোকানে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গুড় সংরক্ষণ ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে খোলা পরিবেশে গুড় সংরক্ষণ ও বিক্রি করায় জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিক্রির জন্য রাখা অধিকাংশ গুড় সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। গুড়ের ওপর ধুলাবালি জমে রয়েছে এবং মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড়ের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। দোকানের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।

এ সময় দোকানে কিছু নষ্ট ও পচনধরা গুড়ও দেখা যায়। এ বিষয়ে দোকানের মালিক রঞ্জিত সাহার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলো মানুষের খাওয়ার জন্য নয়, গরুর খামারে সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে আলাদা করে রাখা হয়েছে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি এসব গুড় সত্যিই গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে বিক্রির জন্য সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে, তাহলে মানুষের খাদ্য হিসেবে বিক্রি হওয়া গুড়ের একই দোকানে সেগুলো কেন রাখা হয়েছে। তাদের মতে, মানুষের খাদ্য ও পশুখাদ্য একই স্থানে সংরক্ষণ করলে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাস্থ্যকর ও পোকামাকড়ে আক্রান্ত পরিবেশে সংরক্ষিত খাদ্য গ্রহণের ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, কলেরা, পেটের সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রয়ের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা অপরিহার্য।

একাধিক এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবেশে গুড় বিক্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তদারকি তাদের চোখে পড়েনি। তাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য বিক্রি হলেও বিষয়টি কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে না। তারা দ্রুত তদন্ত, খাদ্যের মান পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে দোকানের মালিক রঞ্জিত সাহা বলেন, “আমি প্রায় ২৫–৩০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। এ ধরনের কাগজপত্র বা অনুমোদনের জন্য আমাদের কাছে কখনো কেউ আসেনি বা কিছু চায়নি। আমার কোনো কাগজপত্র করা নেই এবং আমার কোনো কাগজপত্র লাগেও না। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নাম করে আমার কাছ থেকে এসে টাকা নিয়ে যেত। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে এখন পর্যন্ত আমি কাউকে কোনো টাকা দিইনি।”

তিনি আরও দাবি করেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য তার কোনো ট্রেড লাইসেন্স, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)-এর নিবন্ধন বা অনুমোদন, টিআইএন সনদ, ভ্যাট (বিন) নিবন্ধন কিংবা অন্য কোনো কাগজপত্রের প্রয়োজন নেই।
তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন অনুযায়ী সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স, প্রয়োজনীয় কর ও ভ্যাট নিবন্ধন (যেখানে প্রযোজ্য), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন বা অনুমোদন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কাগজপত্র থাকতে হয়।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের অধীনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য সংরক্ষণ বা বিক্রয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় খাদ্য বাজারজাতকরণ কিংবা আইনগত শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা, খাদ্যপণ্য জব্দ বা ধ্বংস এবং প্রয়োজনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংবাদে সংযোজন করা হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, জনস্বার্থে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দোকানটির খাদ্য সংরক্ষণের পরিবেশ, নষ্ট ও পচনধরা গুড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং খাদ্যের মান যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।






