তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণের উদ্যোগকে ব্যাহত করতে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও লবিংয়ের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা)। মঙ্গলবার পাঠানো এক বিবৃতিতে বাটা জানায়, সরকারের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক নীতি দুর্বল করতে তামাক কোম্পানির এ চেষ্টা একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে তামাক কোম্পানিগুলোর দেওয়া বিবৃতি অযৌক্তিক, বিভ্রান্তিকর ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এগুলো সরকারের জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার একটি অপকৌশল, যা দেশের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি সরাসরি হুমকি।
বাটার তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা, যেখানে একই সময়ে তামাকজাত পণ্য থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে মাত্র ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশে তামাকজনিত ক্ষতির পরিমাণ রাজস্ব আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। দেশের হাসপাতালগুলোতে ফুসফুস ক্যান্সার, হৃৎরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক সংক্রমণসহ অসংখ্য রোগের জন্য প্রতিবছর লক্ষ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ তামাকজনিত।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান তুলে ধরে বাটা জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু সরাসরি তামাক ব্যবহারের কারণে ঘটে। পাশাপাশি কিশোর-তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিকোটিনে আসক্ত করার একটি কৌশল।
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট অভিযোগ করে যে, বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো নতুন করে ‘ধোঁয়াবিহীন নিকোটিন পণ্যকে কম ক্ষতিকর বিকল্প’ হিসেবে প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু এসব দাবি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও প্রমাণবিহীন। বিশ্বব্যাপী এসব পণ্যের কারণে লক্ষ লক্ষ তরুণ নিকোটিনে আসক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে। তাই এই পণ্যগুলো নিষিদ্ধ করা জরুরি বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বাটা মনে করে, যে কোনো দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তামাক কোম্পানির মুনাফা কখনোই জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করার বিনিময়ে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
জোটটি স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ। এফসিটিসির আর্টিকেল ৫.৩ অনুযায়ী তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিতে তামাক কোম্পানির কোনো প্রভাব বা অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। তাই তামাক কোম্পানিগুলো স্টেকহোল্ডার হিসেবে সরকারের অংশ হওয়ার দাবি করলে তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারের লক্ষ্য—তামাকজনিত মৃত্যু ও রোগ কমিয়ে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত দেশে পরিণত করা। অন্যদিকে তামাক কোম্পানির উদ্দেশ্য—মুনাফা বাড়ানোর জন্য নতুন ভোক্তা তৈরি করা। এই দুই লক্ষ্য বিপরীত হওয়ায় তাদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র জড়িত থাকার সুযোগ নেই।
বাটা মনে করে, প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনী বাস্তবসম্মত, গবেষণাভিত্তিক এবং দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি। সংশোধনী পাস হলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত হবে, এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ কারণে জোট দ্রুততম সময়ে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাসের জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তামাক কোম্পানিগুলোর বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, ভুয়া গবেষণা, গোপন লবিং ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকতে আহ্বান করা হয়।






