জুমার দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য সপ্তাহের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন। এই দিনটি যেমন আধ্যাত্মিক ইবাদতের জন্য নির্ধারিত, তেমনি এটি ইসলামের ইতিহাসে বারবার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনেরও সাক্ষী হয়েছে। জুমার এই দ্বৈত চরিত্র—একদিকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, অন্যদিকে সমাজের জুলুম-অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর হাতিয়ার, যা ইসলামের গতিশীলতা ও প্রাসঙ্গিকতারই প্রতীক।
ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই জুমার দিনটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
নবী মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর প্রথম যে কাজগুলো করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল জুমার নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই নামাজ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, বরং এটি মুসলিম সমাজের সাপ্তাহিক সমাবেশেরও মাধ্যম। জুমার খুতবায় শুধু ধর্মীয় বিষয়ই আলোচিত হতো না, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্প্রদায়ের সমস্যা এবং অনেক সময় রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও দেওয়া হতো।
জুমার দিনের ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম।
আধুনিক যুগে আমরা দেখেছি, ২০১১ সালে মিসরের বিপ্লবে জুমার নামাজ কিভাবে গণ-আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। ২৮ জানুয়ারি, যে দিনটিকে ‘জুমাতুল গাদব’ বা ক্রোধের জুমা নামে অভিহিত করা হয়, সেদিন তাহরির স্কয়ারে জুমার নামাজের পর লক্ষাধিক মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।
ফিলিস্তিনের সংগ্রামে জুমার দিনের ভূমিকা আরো বেশি স্পষ্ট। আল-আকসা মসজিদে জুমার নামাজের পর ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ একটি নিয়মিত ঘটনা। ২০২১ সালের মে মাসে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় জুমার দিনে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। জুমার নামাজ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেরও প্রতীক।
ভারতের শাহিনবাগে ২০১৯-২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতেও জুমার নামাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে জুমার নামাজের পর নারীরা রাস্তায় বসে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি অনন্য দৃশ্য, যেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও গণ-আকাঙ্ক্ষার রাজনীতি একাকার হয়ে গিয়েছিল।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবে জুমার নামাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়াতুল্লাহ খোমেনি জুমার খুতবাকে শাহের বিরুদ্ধে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ইরানে জুমার নামাজ একটি জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে শুধু ধর্মীয় বিষয়ই নয়, বরং জাতীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশে জুমা বারবার ইবাদতের পাশাপাশি প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী ফরায়েজি আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে, এমনকি ২০১৩ সালের হেফাজত ও ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনেও জুমা নামাজের পর গণ-আন্দোলন হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে জুমা ছিল কেন্দ্রবিন্দু। খুতবা ও নামাজ শেষে দেশের বিভিন্ন মসজিদ থেকে মুসল্লিরা রাস্তায় নামে। ধর্মীয় অপপ্রবণতার প্রতিবাদে এই জুমানির্ভর আন্দোলনে প্রাণ হারান বহু মাদরাসা শিক্ষার্থী।
জুমার এই রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। একদল আলেম মনে করেন, জুমার খুতবায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া ইসলামেরই অংশ। তাঁরা নবীজির (সা.) জীবনী থেকে উদাহরণ টানেন, যেখানে তিনি জুমার খুতবায় সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন।
অন্য দলের আলেমরা মনে করেন, জুমার পবিত্রতা রক্ষা করা উচিত এবং এটিকে রাজনীতির মঞ্চে পরিণত করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তারা যুক্তি দেখান যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করলে এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।
আসলে জুমার সত্যিকার শিক্ষা হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে এটি আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত লাভের সুযোগ, অন্যদিকে এটি সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোরও দিন। জুমার মিম্বার থেকে যখন আজানের ধ্বনি ওঠে, তা একই সঙ্গে প্রার্থনার ডাক এবং ন্যায়বিচারের দাবিও বটে।






