সারাদেশ

ক্ষমতাধর প্রভাবশালীদের পেটে কসবার চারগাছ বাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘ওদের খাল’!

দখল-ভরাটে অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী জলপথ, খালের বুকেই দোকানপাট-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান; বর্জ্যে বন্ধ পানিপ্রবাহ, অবৈধ স্থাপনা সরাতে এক সপ্তাহের সময় দিল প্রশাসন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মূলগ্রাম ইউনিয়নের চারগাছ বাজার এলাকায় ঐতিহ্যবাহী ‘ওদের খাল’ দখল ও ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের কিছু সদস্য খালের জায়গা দখল করে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি খালের বিভিন্ন অংশে মাটি ও মানবসৃষ্ট বর্জ্য ফেলার কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
চারগাছ বাজার কসবা উপজেলার মূলগ্রাম ইউনিয়নের একটি পরিচিত বাজার। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, খালটি একসময় প্রায় ১০০ ফুট প্রশস্ত ছিল। তাদের দাবি, তিনলাখ পীর এলাকা থেকে শুরু হয়ে খালটি বাদৈর ইউনিয়ন ও মূলগ্রাম ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে একদিকে নবীনগর উপজেলার তিতাস নদী এবং অন্যদিকে মুরাদনগর উপজেলার বুড়ি নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। ফলে এলাকার পানি নিষ্কাশন, কৃষি ও পরিবেশের জন্য খালটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন অংশ দখল, মাটি ও বর্জ্য দিয়ে ভরাট এবং স্থাপনা নির্মাণের কারণে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের কিছু ব্যক্তি খালের জায়গা দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করছেন। এতে খালের স্বাভাবিক আকৃতি ও পানি চলাচলের পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, খালের জায়গা কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন না হওয়া সত্ত্বেও কোথাও কোথাও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনার কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বর্জ্য জমে পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে চারগাছ বাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘ওদের খাল’ দখল, ভরাট ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি কসবা উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (১২ আগস্ট) সরেজমিনে খালটি পরিদর্শন করেন কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামিউল ইসলাম।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খালের বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক নেই। কোথাও স্থাপনা, কোথাও ময়লা-আবর্জনা এবং কোথাও ভরাটের কারণে খালের জায়গা সংকুচিত হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
পরিদর্শন শেষে কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিউল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, খালটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ যে বিঘ্নিত হচ্ছে, সরেজমিনে এসে তা তার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। খালের ওপর দোকানপাট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে মানবসৃষ্ট বর্জ্য ফেলার কারণে খালটি অনেকাংশে সংকুচিত ও বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
তিনি জানান, খালের মধ্যে থাকা মানবসৃষ্ট বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া এবং যারা অবৈধভাবে খালের ওপর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা নির্মাণ করেছেন, তাদের সেসব স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য এক সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্য অপসারণ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত দৈনিক আমাদের সমাচার অনলাইন মাল্টিমিডিয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি মোঃ মোস্তফার সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, চারগাছ বাজারের ‘ওদের খাল’ বর্তমানে দখল, স্থাপনা ও বর্জ্যের চাপে তার স্বাভাবিক চরিত্র হারানোর অভিযোগ রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এভাবে সংকুচিত হতে থাকলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মোঃ মোস্তফা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খালটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ ও আলোচনা থাকলেও কার্যকরভাবে খালটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে আসার পর প্রশাসনের সরেজমিন পরিদর্শন নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দখল চিহ্নিত করে সরকারি জায়গা উদ্ধার এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, খালটি দখল ও বর্জ্যে ভরাট হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এই খালটি আমাদের এলাকার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান পথ। খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং বর্জ্য ফেলার কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত খালটি দখলমুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাই।”
আরেক বাসিন্দা বলেন, “প্রভাবশালী মহলের কিছু লোক খালের জায়গা দখল করে ব্যবসা করছে বলে আমরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছি। এখন ইউএনও সাহেব সরেজমিনে এসে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। আমরা চাই, কথার সঙ্গে দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপও নেওয়া হোক।”


সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, একটি খাল শুধু পানি নিষ্কাশনের পথ নয়; এটি একটি এলাকার পরিবেশ, কৃষি, জনজীবন ও সামাজিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাল দখল ও ভরাটের কারণে পানিপ্রবাহ বন্ধ হলে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগ বাড়তে পারে। তাই শুধু একবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; খালের সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং ভবিষ্যতে দখল প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, খালটি সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হলে এবং তদন্তে অবৈধ দখল, স্থাপনা নির্মাণ বা ভরাটের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন আইনে ও কোন ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা খালের সরকারি রেকর্ড, জমির শ্রেণি, সীমানা এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর আওতায় সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে দখল, সেখানে স্থাপনা নির্মাণ কিংবা অবৈধভাবে ভরাটের ঘটনায় শাস্তির বিধান রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে এবং অবৈধ দখল বা স্থাপনা অপসারণ করে ভূমিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী বা ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে ঘোষণা করার আগে সরকারি রেকর্ড যাচাই, তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্য নেওয়াও প্রতিবেদনের ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
খালের প্রকৃত সীমানা ও সরকারি জমির বিষয়টি যাচাইয়ে উপজেলা ভূমি অফিসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খতিয়ান, নকশা ও মাঠপর্যায়ের পরিমাপের মাধ্যমে খালের সীমানা নির্ধারণ করা হলে কোন স্থাপনা খালের জায়গায় এবং কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায়—তা স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে পানি প্রবাহ ও পুনঃখননের কারিগরি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। খালে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ থাকায় পরিবেশগত বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসী কসবা-আখাউড়ার সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানেরও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, প্রশাসনের চলমান উদ্যোগের পাশাপাশি সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখলে খালটি দ্রুত দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
এলাকাবাসী বলেন, “আমরা কসবা-আখাউড়ার অভিভাবক হিসেবে মাননীয় সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের কাছে দাবি জানাচ্ছি—খালটি দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমরা একটি স্বচ্ছ, দখলমুক্ত ও প্রাণবন্ত খাল দেখতে চাই।”
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে দখল, স্থাপনা নির্মাণ বা অবৈধভাবে ভরাটের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনা বা দখল অপসারণ করে ভূমিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে শাস্তির ধরন ও পরিমাণ নির্ধারিত হবে তদন্ত, সরকারি রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ধারার ভিত্তিতে।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এক সপ্তাহের সময়সীমা ঘোষণায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্য অপসারণ করা হয় কি না এবং প্রশাসন পরবর্তী সময়ে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
চারগাছ বাজারের ‘ওদের খাল’ এখন শুধু একটি খাল রক্ষার বিষয় নয়; এটি এলাকার পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী মহলের দখলের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন, সরকারি জায়গা চিহ্নিতকরণ এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি খালটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হোক।

নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply