সারাদেশ

মসজিদ কমিটির সেক্রেটারির ভাইদের বিরুদ্ধে মাদক, জুয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ

“মসজিদ কমিটির সেক্রেটারির ভাইদের বিরুদ্ধে মাদক, জুয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্ফোরক অভিযোগ — উত্তাল কাউন্দিয়া”
স্থানীয়দের দাবি— দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলেছে মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর ও অসামাজিক কার্যকলাপ; নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা এলাকাবাসীর।
পর্ব ১
ঢাকার সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নের বাগসাত্রা ঘাটপার জামে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি জাবেদের দুই ভাই জলিল ও জাকিরের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর পরিচালনা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই জলিল এলাকায় মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত এবং জাকির তার নিজ বাসায় নিয়মিত জুয়ার আসর বসানোর পাশাপাশি অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনা করে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে এসব কর্মকাণ্ড গোপনে চললেও গত কয়েক মাস ধরে তা আরও প্রকাশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে অভিযুক্তদের প্রভাব ও ভয়ের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, জাকিরের বাড়িতে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনের যাতায়াত দেখা যায় এবং গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে জুয়া খেলা ও নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “এলাকায় এসব অনেক দিন ধরেই চলছে, কিন্তু প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারে না।”
স্থানীয়দের দাবি, মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি জাবেদের পারিবারিক প্রভাব থাকায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির পরিবারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জলিল ও জাকিরের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও তাদের ভাই ও বাগসাত্রা ঘাটপার জামে মসজিদের সেক্রেটারি জাবেদ বলেন, “আমার ভাইদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, একটা সময় তা সত্য ছিল। কিন্তু আমি মসজিদের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমার ভাইদেরসহ এলাকার সব মাদক ব্যবসায়ী, জুয়ারি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের সতর্ক করেছি। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে, সে আমার পরিবারের সদস্য হলেও ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমার জানা মতে বর্তমানে তারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে।”
এ বিষয়ে বাগসাত্রা ঘাটপার জামে মসজিদের সভাপতি হানিফ মেম্বার বলেন, “মসজিদের কমিটি এককভাবে গঠন করা হয়নি। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতেই দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। কেউ অপরাধ করলে দায় তার নিজের। তারপরও সমাজ থেকে মাদক, জুয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্মূলে আমরা আলোচনা করেছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সেক্রেটারি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।”
মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ কুদ্দুস মেম্বার বলেন, “এক পরিবারের একজনের অপরাধের দায় আরেকজনের ওপর চাপানো ঠিক নয়। তবে জলিলের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা এবং জাকিরের বিরুদ্ধে জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ স্থানীয়ভাবে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেব।”
মসজিদের ইমাম মাওলানা সাইদুল ইসলাম বলেন, “সেক্রেটারির এক ভাই মাদকের সঙ্গে জড়িত— এমন কথা শুনেছি। তবে জুয়ার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য আমার জানা নেই।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, জাবেদ একসময় কাউন্দিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শান্ত খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বর্তমানে তিনি কাউন্দিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং ড্রেজার ভাড়া এনে বিভিন্ন এলাকায় বালু ভরাটের কাজও পরিচালনা করছেন বলে জানা যায়।
এলাকাবাসীর দাবি, ইউনিয়নের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে বিতর্কিত পরিবারের সদস্য জাবেদকে মসজিদ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়রা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “মসজিদ কমিটি যেখানে সমাজ থেকে মাদক ও জুয়া নির্মূলে কাজ করবে, সেখানে যদি দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরিবারই এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তাহলে সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম কী শিক্ষা পাবে?”
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামে মাদক, জুয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ হারাম ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এসব কর্মকাণ্ড সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে এবং যুবসমাজকে বিপথগামী করে তোলে। তারা বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই অভিযোগগুলো দ্রুত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, মাদক ও জুয়ার বিস্তার সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের অন্যতম কারণ। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও প্রচলিত ফৌজদারি আইনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার এক কর্মকর্তা বলেন, “লিখিত অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে এলাকায় শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসে। বর্তমানে পুরো কাউন্দিয়াজুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— “ইউনিয়নের রক্ষকই যখন ভক্ষক, তখন সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?”

Leave a Reply