বৃহস্পতিবার কিংবদন্তি কবি, গীতিকার, গল্পকার ও পল্লীসংস্কৃতির পথিকৃত আবদুল হাই মাশরেকীর ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৮৮ সালের এই দিনে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দত্তপাড়ায় নিজ গ্রামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লোকজ বাংলা সাহিত্যকে যিনি গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল ভাষায় সার্থকভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, আজ তারই স্মরণ দিবস।
আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই আল্লাহ’, ‘মাঝি বাইয়া যাও রে আমার কাঙ্খের কলসি ‘প্রাণ সখিরে বাবলা বনের ধারে ধারে আমার বাড়ি যাইও বন্ধু এমন শত শত জনপ্রিয় গান ও কবিতার স্রষ্টা মাশরেকী বাঙালির মাটি, মানুষ, দুঃখ, সংগ্রাম ও ভালোবাসাকে সুর ও ভাষায় অমর করে গেছেন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
কবি ১৯১৯ সালের ১ এপ্রিল ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাঁকনহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। (কিছু স্থানীয় উৎসে ১৯০৯ সালও উল্লেখ আছে।) পিতা ওসমান গণি ছিলেন জমিদারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়, মাতা রহিমা খাতুন ছিলেন স্নেহশীলা গৃহিণী। শৈশব থেকেই গান ও কবিতা রচনার প্রতি তার ঝোঁক ছিল প্রবল।
পড়াশোনা শেষ না করেই জীবিকার সন্ধানে তিনি কলকাতায় যান। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হয়ে ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কাজ করেন এবং মাসিক ‘কৃষিকথা’ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্যজীবন
লোকজ সংস্কৃতি, কৃষক-জীবন, প্রেম, সংগ্রাম—এই চার মূলধারাকে কেন্দ্র করে তিনি রচনা করেন পল্লীগীতি, কবিতা, জারি, গীতিনাট্য, গল্প ও নাটক। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে—
কাব্য: কিছু রেখে যেতে চাই, হে আমার দেশ, দেশ দেশ নন্দিতা, মাঠের কবিতা মাঠের গান, কাল নিরবধি
গীতিনাট্য/জারি: ভাটিয়ালী, রাখালবন্ধু, জরিনা সুন্দরী, ডাল ধরিয়া নুয়াইয়া কন্যা, দুখু মিয়ার জারি
গল্প: কুলসুম, বাউল মনের নকশা, মানুষ ও লাশ, নদী ভাঙে
নাটক: সাঁকো, নতুন গাঁয়ের কাহিনী
অনুবাদ: আকাশ কেন নীল
তবে নির্ভরযোগ্য কোনো উৎসে তিনি মোট কতটি গান, কবিতা, গল্প বা নাটক রচনা করেছেন—এর সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায় না। গবেষকরা বলেন, তার রচনা সংখ্যা কয়েক শ ছাড়িয়েছে।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নানা আয়োজন
কবির জন্মভূমি ঈশ্বরগঞ্জে আজ সকাল ১০টায় ‘আবদুল হাই মাশরেকী পরিষদ’–এর উদ্যোগে কবির সমাধি জিয়ারত, কোরআন তেলাওয়াত ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া আগামী ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে ‘কবি আবদুল হাই মাশরেকী গবেষণা কেন্দ্র’ এবং ‘জনপ্রশাসন’ পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে ‘এসো গণতন্ত্র গড়ে তুলি নতুন দিনের’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন।
মাটি ও মানুষের কবি আবদুল হাই মাশরেকী তার সৃষ্টিকর্মে বাঙালির গ্রামীণ জীবনকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি বাংলা সাহিত্যে লোকজ শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে নতুন প্রজন্মের কাছে এই কালজয়ী কবির সৃষ্টিকে আরও পরিচিত ও সংরক্ষণযোগ্য করে তোলার দাবি উঠেছে সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে।






