গুদারাঘাটে মাদকের ‘অন্ধকার সাম্রাজ্য’!—প্রকাশ্য সড়কে ইয়াবা-গাঁজার বেচাকেনার অভিযোগ, একাধিক ব্যক্তির নাম ঘিরে চাঞ্চল্য; অসাধু সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও
রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী থানাধীন এলাকাজুড়ে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। এরই মধ্যে শাহ আলী থানাধীন গুদারাঘাট এইচ ব্লকের ১৫ নম্বর রোড যেন মাদকের নিরাপদ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, গুদারাঘাট, বটতলা, শাহ আলী মাজারসংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা চলছে। প্রকাশ্য সড়ক ও জনবহুল এলাকায় মাদক বিক্রির এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগে আরও বলেন, সজীব ও তার স্ত্রী ইয়াসমিনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের রমরমা কারবার চলছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ১০ থেকে ১৫ জন কথিত বিক্রয়কর্মীর মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রতিদিন আনুমানিক ১ থেকে দেড় হাজার পিস ইয়াবা এবং ৮ থেকে ১০ কেজির মতো গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক বিক্রি হয়।
তবে এসব পরিমাণের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়রা অভিযোগে আরও বলেন, সজীব কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে হয়।
মাদক ব্যবসা নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে অসুস্থতার কথা তুলে আর্থিক সংকটের বিষয়টি সামনে আনেন বলেও তাদের দাবি। তার অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনা করে অনেকে সরাসরি প্রতিবাদ করতে সাহস পান না বলে জানিয়েছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, অসুস্থতা চিকিৎসার বিষয় হতে পারে, কিন্তু কোনো অপরাধের ঢাল হতে পারে না।
অসুস্থতার আড়ালে যদি মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করা প্রয়োজন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, শুধু সজীব ও ইয়াসমিন নয়, সজীবের মা পিয়ারা বেগম, সৎভাই রাসেল, ভাতিজা রাতুলসহ আরও কয়েকজনের নামও মাদক বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
স্থানীয়রা অভিযোগে আরও বলেন, ‘সালু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি, কাল্লু, জাকির, জাকিরের স্ত্রী ও শুকুরের নামও বিভিন্ন সময় মাদক বিক্রি, সরবরাহ বা সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গে উঠে এসেছে।
তাদের দাবি, এসব ব্যক্তির কেউ কেউ গুদারাঘাট ও আশপাশের এলাকায় মাদক সরবরাহ বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
তবে এসব তথ্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্যও এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পাওয়া যায়নি।
তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয়রা অভিযোগে আরও বলেন, গুদারাঘাটের পাশাপাশি শাহ আলী মাজারসংলগ্ন ব্যস্ততম মূল সড়কেও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির দৃশ্য দেখা যায়। ২৪ ঘণ্টায় যেখানে অসংখ্য পথচারীর চলাচল, সেই ব্যস্ত সড়কের পাশে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষকে পলিথিনে করে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের পোটলা নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, ক্রেতাদের কাছে প্রকাশ্যেই এসব মাদকদ্রব্য বিক্রি করা হয়। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, অনেক সময় টহল পুলিশের উপস্থিতিতেও এসব বেচাকেনা চলতে দেখা যায় বলে তারা জানিয়েছেন। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
স্থানীয়দের আরও দাবি, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মিরপুর-শাহ আলী এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী কিছু অসাধু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের ভাষ্য, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার কারণে একাধিক মাদক কারবারি নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, ইউনুস ভবঘুরে, রানা, জয় ও মনির নামে কয়েকজন কথিত সোর্সের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগাযোগ রয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা নেন—এমন অভিযোগের পক্ষে প্রত্যক্ষ বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “কোনো কর্মকর্তা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকলে সেটি গুরুতর অপরাধ। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো কর্মকর্তাকে দায়ী করা উচিত নয়।”
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও রাজধানীর মিরপুর এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির এমন পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও শাহ আলী থানা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবুল কালাম লেলিন বলেন, “মাদক একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কেউ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা হবে, কিন্তু অসুস্থতার অজুহাতে মাদক ব্যবসা করার সুযোগ নেই। প্রশাসনের প্রতি আমাদের আহ্বান, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
অন্যদিকে, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তর-এর যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদুল মিরাজ বলে স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর দাবি। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক নির্মূলের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন সময় মাদকবিরোধী কার্যক্রম ও অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে একপর্যায়ে তাকে প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে এ তথ্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মী যেন প্রশাসনিকভাবে হয়রানি বা প্রশ্নবিদ্ধ না হন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলেন, “মাদক একটি এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিবেশ দুটোকেই ধ্বংস করে। গুদারাঘাট, বটতলা ও শাহ আলী মাজারের আশপাশে যদি প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির এমন দৃশ্য দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়িয়ে মাদকের মূল হোতাদের চিহ্নিত করা হোক এবং নিরপরাধ কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়।”
দৈনিক আমাদের সমাচার অনলাইন মাল্টিমিডিয়ার চিফ রিপোর্টার বলেন, “গণমাধ্যমের কাজ হলো জনস্বার্থের বিষয় সামনে আনা। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির দৃশ্য যদি মানুষের চোখের সামনে দেখা যায়, তাহলে সেটি অবশ্যই প্রশাসনের নজরে আসা উচিত। পুলিশের টহল বা মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও যদি মাদক বিক্রির কার্যক্রম চলে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, ডিলার ও অর্থের লেনদেনের পথও খুঁজে বের করতে হবে।”
গুদারাঘাটের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাদকের কারণে এলাকার পরিবেশ নিয়ে আমরা আতঙ্কে রয়েছি। সন্তানদের নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকতে হয়। ১৫ নম্বর রোড থেকে মাজারের রাস্তা পর্যন্ত প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।”
আরেক বাসিন্দা বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথা বললে অনেকে ভয় পান। বটতলা ও মাজারের মূল সড়কের পাশে প্রকাশ্যে গাঁজার পোটলা বিক্রি হতে দেখা যায়। অনেক সময় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আমরা চাই প্রশাসন গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করুক।”
অন্য এক ভুক্তভোগী এলাকাবাসী বলেন, “শুধু খুচরা বিক্রেতাদের আটক করলে হবে না। মাদকের মূল সরবরাহকারী, ডিলার এবং অর্থের উৎস খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই মাদকের কারবার বন্ধ করা সম্ভব।”
একজন সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, “একটি এলাকায় দীর্ঘদিন মাদক ব্যবসা চলতে থাকলে এর প্রভাব পুরো সমাজে পড়ে। কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়লে পারিবারিক অশান্তি, অপরাধপ্রবণতা এবং শিক্ষাজীবন ধ্বংসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাদক নিয়ন্ত্রণে খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি সরবরাহকারী, ডিলার, অর্থের উৎস এবং পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বানানো উচিত নয়; তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
শাহ আলী থানার অফিসার ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান কঠোর। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ অসুস্থ থাকলে চিকিৎসা নেবেন, কিন্তু অসুস্থতার অজুহাতে মাদক বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই।”
এলাকাবাসীর দাবি, গুদারাঘাটের ১৫ নম্বর রোড, বটতলা এবং শাহ আলী মাজারের মূল সড়কসহ পুরো শাহ আলী থানাধীন এলাকায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হোক। প্রকাশ্যে গাঁজা বা অন্য কোনো মাদক বিক্রির কার্যক্রম বন্ধ করার পাশাপাশি মাদকের মূল সরবরাহকারী ও ডিলারদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে টহল পুলিশ বা মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। সজীব, ইয়াসমিন, পিয়ারা বেগম, রাসেল, রাতুল, ‘সালু’, কাল্লু, জাকির, জাকিরের স্ত্রী ও শুকুরসহ যাদের নাম বিভিন্ন অভিযোগে এসেছে, তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক।






