জীবদ্দশায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে ছিল কেবল এক চিলতে বসতভিটা। কিন্তু মৃত্যুর পরও সাড়ে তিন হাত মাটির নিজস্ব কোনো জায়গা না থাকায় এক বৃদ্ধের শেষ ঠিকানা হয়েছে তারই শোবার ঘরের মেঝেতে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার তাতিহাটী ইউনিয়নের শালমারা গ্রামে। নিজস্ব জমি ও গ্রামে কোনো সামাজিক বা গণকবরস্থান না থাকায় আব্দুল করিম (৬০) নামের ওই বৃদ্ধের মরদেহ বসতঘরের ভেতরেই দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে এ ঘটনা জানাজানি হলে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মৃত আব্দুল করিম শালমারা গ্রামের মৃত শমসের আলীর ছেলে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্বল বলতে আব্দুল করিমের শুধু মাথা গোঁজার একটি ছাপরা বসতঘর ছাড়া কোনো ফসলি বা বাড়তি জমিজমা নেই। অন্যদিকে পুরো শালমারা গ্রামে বিত্তবানদের ব্যক্তিগত পারিবারিক কবরস্থান থাকলেও সাধারণ ও ভূমিহীন মানুষের জন্য কোনো সামাজিক বা গণকবরস্থান নেই। ফলে যাদের নিজস্ব জায়গা নেই, তাদের কোনো স্বজন মারা গেলে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে অনেকেই বাড়ির উঠান বা বসতঘরের পাশে লাশ দাফন করেন। তবে আব্দুল করিমের ক্ষেত্রে ঘরের বাইরে এক ইঞ্চি খালি জায়গাও না থাকায় স্বজনরা ঘরের ভেতরের মেঝে খুঁড়ে সেখানেই মরদেহ দাফন করেন।
গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ মিয়া আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকার জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের কাছে শালমারা গ্রামে একটি সর্বজনীন গণকবরস্থান করার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। আজ নিজস্ব জমি না থাকায় আব্দুল করিমকে তার নিজের ঘরেই দাফন করতে হলো। এটি একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক ও অত্যন্ত দুঃখজনক দৃশ্য।’
বাবার বিয়োগব্যথায় কাতর মেয়ে রিক্তা পারভীন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের বসতঘর ছাড়া বাইরে আর কোনো জমি নেই। চরম নিরুপায় হয়ে বাবাকে নিজের ঘরের মেঝেতেই দাফন করতে হয়েছে। আমাদের পরিবারের মতো অন্য কোনো স্বজনকে যেন এমন নির্মম পরিস্থিতির শিকার হয়ে ঘরে দাফন করতে না হয়, সেজন্য গ্রামে অবিলম্বে একটি সরকারি গণকবরস্থান প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছি।’
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। তাতীহাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুর রউফ জানান, গ্রামে গণকবরস্থান না থাকার বিষয়টি তারা জানতে পেরেছেন। মঙ্গলবার নিহতের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে পাশের ষাইটকাকড়া এলাকার একটি গণকবরস্থানে মরদেহটি সম্মানের সঙ্গে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা আহমেদ বলেন, ওয়ার্ডটিতে কোনো সামাজিক কবরস্থান না থাকায় ঘরের মেঝেতে মরদেহ দাফনের খবর তারা পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কথা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিনে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে পাশের ওয়ার্ডের সামাজিক কবরস্থানে মরদেহ স্থানান্তরের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, ‘সমাজে একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর সামাজিক কবরস্থানে তার জন্য একটু ঠাঁই হবে না—এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও দুঃখজনক ঘটনা। বিষয়টি জানার পরপরই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বৃদ্ধের বাড়ির পার্শ্ববর্তী কবরস্থানে তার মরদেহ স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত এবং তাৎক্ষণিকভাবে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্যকেও পুরো ঘটনাটি অবহিত করেছেন।






