সারাদেশ

মাদকের অভয়ারণ্য কাউন্দিয়া: ১৭২ পিস ইয়াবাসহ ‘গ্যাস টিটু’ গ্রেপ্তার

সাভার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬: সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের কারবার চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, খুচরা বিক্রেতা ও নেপথ্যে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

এতে মাদকের বিস্তার কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাদকবিরোধী অবস্থানের ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরদারের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।

রোববার (২৫ অক্টোবর) সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নে নবনিযুক্ত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে ১৭২ পিস ইয়াবাসহ টিটু ওরফে ‘গ্যাস টিটু’কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গ্রেপ্তার টিটু চিহ্নিত মাদক কারবারি আনিস ওরফে ‘পাসপোর্ট আনিসের’ আপন ছোট ভাই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাউন্দিয়া ইউনিয়নের মধ্যপাড়া, বাঘসাত্রা, পশ্চিমপাড়া, বুড়িরটেক, বাগিরচা, পাঁচকানি, গাসিরদিয়া, বাইদাপাড়া, চেয়ারম্যান প্লট, জামাইমারা ও সুদুরটেকসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানে পুরো মাদক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কার্যকর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় সূত্রে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে বাগিরচার শহিদ, জামাইমারার মোস্তাক, গাসিরদিয়ার বাতেনের ছেলে প্রান্ত, আকিম উদ্দিনের ছেলে ইসমাইল, নূহু ও কাজিম উদ্দিনের নাম উঠে এসেছে। পাঁচকানির মিয়া হোসেনের ছেলে নাছেরের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলার অভিযোগ রয়েছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেছেন। বুড়িরটেকের জনির বিরুদ্ধে কিশোরদের ব্যবহার করে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।

এ ছাড়া জাহাঙ্গীর ওরফে ‘ন্যাংড়া জাহাঙ্গীর’, মাইনকারটেকের জহির, টিগালটেকের সজিব এবং বাবুল ওরফে ‘টাইগার বাবুলের’ বিরুদ্ধে মাদক কারবার ও সরবরাহে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে ‘টাইগার বাবুলের’ বিরুদ্ধে পুলিশ ফাঁড়ির কাছাকাছি এলাকায় পাইকারি ইয়াবা সরবরাহের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।

বাকসাত্রার জলিল ও আলী ওরফে ‘পিচ্চি আলী’, পশ্চিমপাড়ার কাল্লু ও সোহেল, মধ্যপাড়ার দেলু ও বাবু, বাইদাপাড়ার শফিক, ৯৩ নম্বর চেয়ারম্যান প্লটের সেলিম ওরফে ‘কসাই সেলিম’, মুনসুরের ছেলে সুমন, সজল, মধ্যপাড়ার বাবু, রনি, জনি, বাকসাত্রার জাবেদ, পোটলা, রুবেলের ভাই নুরু ও আলী, বাগিরচার জামান ও বাদল, জামাইমারার সাজ্জাদ ও মোস্তাক, গাসিরদিয়ার সৈকত এবং পশ্চিমপাড়ার রিয়াদের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।

এদিকে একাধিক স্থানীয় সূত্রের দাবি, আনিস ওরফে ‘পাসপোর্ট আনিসের’ ছেলে মিরপুর মডেল থানায় বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল পদে কর্মরত রয়েছেন।

একজন কর্তব্যরত পুলিশ কনস্টেবলের পিতা হয়ে আনিস ওরফে ‘পাসপোর্ট আনিস’ এবং তাঁর আপন ভাই টিটু ওরফে ‘গ্যাস টিটু’ মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যের পরিবারের কেউ যদি আইনবহির্ভূত কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, মাদক যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদক সেবনের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়ছেন।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, কাউন্দিয়ায় মাদক কারবারের বিস্তারের পেছনে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অসাধু মহলের সহযোগিতা থাকতে পারে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়, আর্থিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। সাবেক কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল আলম খানের সঙ্গে পরিচিত বলে স্থানীয়দের উল্লেখ করা আলমাসের বিরুদ্ধেও মাদক বিস্তারের নেপথ্যে ভূমিকা রাখার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

স্থানীয়দের মতে, শুধু মাদক বহন বা খুচরা বিক্রির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের চালান কোথা থেকে আসে, কারা অর্থায়ন করে, কারা পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত এবং কেউ প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত বাধাগ্রস্ত করছেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক কারবারে সহযোগিতার অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কাউন্দিয়া ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থান মাদকবিরোধী অভিযানে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে স্থানীয়দের দাবি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রহিমের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও নদীপথে টহলের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাবে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নদীপথে টহলের সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় নৌযান, জনবল ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা গেলে অভিযান আরও কার্যকর হতে পারে।

মাদক ব্যবসা একটি গুরুতর অপরাধ এবং সমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এর প্রভাবে তরুণ প্রজন্মের শিক্ষা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাদকাসক্তির কারণে পরিবারে অশান্তি, আর্থিক সংকট ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে। তাই মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মাদকদ্রব্যের অবৈধ উৎপাদন, বহন, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিক্রি ও সরবরাহের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। মাদকের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হয়। তাই ১৭২ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় জব্দতালিকা, মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কাউন্দিয়ার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান যেন শুধু সাময়িক গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং মাদকের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নদীপথে নজরদারি জোরদার এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে তথ্য দেওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এবং নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

কাউন্দিয়াকে মাদকমুক্ত করতে প্রয়োজন ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Leave a Reply