অপরাধ ও দুর্নীতি

সাতবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুশিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাতবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জি. এম. গোলাম হোসাইনের বিরুদ্ধে এক সাবেক শিশুশিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীর ৩২পৃষ্ঠা লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে , তার মায়ের বক্তব্য এবং ঘটনার বিষয়ে জানেন এমন একাধিক ব্যক্তির ভিডিও বক্তব্যসহ বিভিন্ন নথি দৈনিক আমাদের সমাচারের হাতে এসেছে। অভিযোগকারী পরিবার এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছে।

অভিযোগপত্রে ওই শিক্ষার্থী উল্লেখ করেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই প্রধান শিক্ষক জি. এম. গোলাম হোসাইন তাকে বিভিন্ন সময় শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে ডেকে নিতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে যৌন নিপীড়ন করা হয়। বিষয়টি পরিবারকে জানালে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও লিখিত বক্তব্যে দাবি করেছে শিক্ষার্থী।তবে ওই শিক্ষার্থী এখন হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় প্রাইমারি স্কুলটি তার পার্শ্ববর্তী স্কুল হওয়ায় ওই ছাত্রীকে এখনো ডেকে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছেন প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জি. এম. গোলাম হোসেন।

শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, ভয় ও সামাজিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সে দীর্ঘদিন পরিবারের কাছে ঘটনাগুলো প্রকাশ করেনি। পরবর্তীতে একই ধরনের ঘটনা চলতে থাকায় একপর্যায়ে বিষয়টি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাছে জানায় এবং পরে পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনাগুলো প্রকাশ করে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীর মায়ের কাছে ফোন করে পড়াশোনা, কোচিং কিংবা বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা বলে তাকে বিদ্যালয়ে বা তার কাছে পাঠাতে বলতেন। শিক্ষার্থী যেতে অনিচ্ছুক হলেও পরিবারের চাপে তাকে যেতে হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাফিয়া ম্যাডামের বিরুদ্ধেও সহযোগিতার অভিযোগ

অভিযোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাফিয়া ম্যাডামের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীকে প্রধান শিক্ষকের কাছে পাঠানো এবং কোনো কোনো ঘটনায় বাইরে অবস্থান করে সহযোগিতা করার অভিযোগ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীর লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক যখন তাকে ডাকতেন, তখন সাফিয়া ম্যাডাম তাকে ডেকে দিতেন অথবা অন্য শিশুদের দিয়ে ডেকে পাঠাতেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক তাকে অফিসে নিয়ে যাওয়ার পর সাফিয়া ম্যাডাম বাইরে অবস্থান করতেন এবং কোনো কোনো সময় ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখতেন।

তবে সাফিয়া ম্যাডামের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষা অফিসে লিখিত অভিযোগ, ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক তদন্ত

অভিযোগকারী পরিবারের পক্ষ থেকে জানা গেছে, ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে শিক্ষার্থীর মা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, যশোর। বরাবর অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গোপনীয় তদন্ত ও প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেন।

পরিবারের দাবি, ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে ঘটনাটির একটি প্রাথমিক তদন্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের পরেই লিখিত কোন প্রতিবেদন বা আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি বলে পরিবার জানিয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে শিক্ষার্থীর লিখিত বক্তব্যের পাশাপাশি তার ভিডিও বক্তব্য, মায়ের ভিডিও বক্তব্য, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে দেওয়া অভিযোগের কপি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং কয়েকজন সাক্ষীর ভিডিও বক্তব্য দৈনিক আমাদের সমাচার পত্রিকার হাতে এসেছে।  অভিযোগকারী পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী তার লিখিত বক্তব্যে বিষয়টি গোপনে তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অন্য কোনো শিশুর সঙ্গে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে সাতবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জি. এম. গোলাম হোসাইন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘ ১১ বছর ৯ মাস ধরে এখানে চাকরি করছি। আমাকে ফাঁসানোর জন্য এসব মিথ্যা, বানানো ও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা ছড়ানো হচ্ছে। আমি ২৭ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। একই চেয়ারে থেকে আমার জীবনে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।”

তিনি আরও জানান, এর আগে তিনি বরান্দারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষা অফিস থেকে গত ৯ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি

অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, ঘটনার পর তারা ভয়ভীতি ও বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন। শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও তারা আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, তদন্তের ফলাফল এবং পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply