দুই এমপির ফোনের পর শর্তসাপেক্ষে ছাড়, ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয়-কৃষিজমির ওপর দিয়ে সেতু; প্রকল্পের অনুমোদন ও ভরাট নিয়ে বিতর্ক
ঢাকার সাভার উপজেলার উত্তর কাউন্দিয়া এলাকায় তুরাগ নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠছে বিশাল এক আবাসন প্রকল্প। প্রায় ৯ হাজার ৫০০ বিঘা জমির ওপর ‘ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালি’ নামে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে তৈরি করা হচ্ছে হাজার হাজার প্লট। তবে এই আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। প্রকল্পের অনুমোদন, কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের অভিযোগ এবং সরকারি অর্থে নির্মাণাধীন একটি সেতুর অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই তুরাগ নদীর তীরবর্তী নিচু জমি, জলাশয় ও কৃষিজমি ভরাট করে প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতু আবাসন প্রকল্প এলাকার মধ্য দিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সেতু সাধারণ মানুষের যোগাযোগ সুবিধার পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের জমির মূল্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তুরাগ নদীর আশপাশের এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ফেলে বিভিন্ন জমি ভরাট করা হয়েছে। এতে এলাকার প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ, কৃষি জমি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্য আশপাশের জমি নিয়ে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। জমির মূল্য পরিশোধ, দখল ও হস্তান্তর নিয়ে অনেকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের দাবি, জমি সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে গেলে অনেক সময় হয়রানির মুখে পড়তে হয়।
তুরাগ নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০৭ দশমিক ৫০ মিটার। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে নির্মাণাধীন এই সেতুর অবস্থান নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে লোকালয় থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে একটি আবাসন প্রকল্প এলাকার মধ্য দিয়ে সেতু নির্মাণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজউক অনাপত্তি দিতে রাজি না হওয়ায় স্থানীয় দুই সংসদ সদস্যের (এমপি) মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে কয়েকটি শর্ত যুক্ত করে সেতু নির্মাণে অনাপত্তি দেয় রাজউক।
রাজউকের নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এলজিইডির অধীনে ‘পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার উত্তর কাউন্দিয়া এবং মিরপুর থানার নবাবেরবাগ মৌজায় তুরাগ নদীর ওপর ৪০৭ দশমিক ৫০ মিটার সেতু নির্মাণে শর্তসাপেক্ষে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের ওই নথিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত সেতুর অ্যালাইনমেন্ট ও অ্যাপ্রোচ সড়কের আওতাভুক্ত ১৯টি আরএস দাগের জমি এবং পার্শ্ববর্তী কিছু জমি ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) অনুযায়ী জলাশয়, কৃষিজমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
নথিতে উল্লেখ করা আরএস দাগগুলো হলো—৪৩২৩, ৪৩২২, ৪৩২১, ৪৩২০, ৪৩১৯, ৪৩১৮, ৪৩১৭, ৪৩১৬, ৪৩১৪, ৪৩১৩, ৪৩১২, ৪১১৮, ৪১১২, ৪১২০, ৪১২৭, ৪১২৮, ৪১৩০, ৪১৩১ ও ৪১৩২।
রাজউক জানিয়েছে, এসব এলাকায় নির্ধারিত শর্ত মেনে সেতু নির্মাণ করা হলে তাদের আপত্তি থাকবে না। তবে শর্তের মধ্যে ছিল নির্মাণকাজ শুরুর আগে বিআইডব্লিউটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থার অনুমোদন নেওয়া।
এ ছাড়া রাজউক শর্ত দিয়েছিল, কাউন্দিয়া এলাকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করতে হবে। ড্যাপ অনুযায়ী বন্যাপ্রবাহ ও জলাশয় এলাকায় ভায়াডাক্টের মাধ্যমে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে হবে। পানিপ্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজউকের দেওয়া এসব শর্ত বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে তা নিয়ে পর্যাপ্ত তদারকি নেই।
এদিকে সেতু নির্মাণের উদ্যোগের পর ওই এলাকায় জমির দাম বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবাসন প্রকল্পের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্লট বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ নগরায়ণের কথা তুলে ধরে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
তবে কয়েকজন ক্রেতার অভিযোগ, টাকা পরিশোধের পরও অনেকে নির্ধারিত প্লট বুঝে পাচ্ছেন না। তারা জানান, প্রকল্পের নির্দিষ্ট জায়গা ও কাগজপত্র নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ভূমি ব্যবহারের আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এসব নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।
তাদের মতে, সরকারি অর্থে নির্মিত কোনো অবকাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হতে হবে জনসাধারণের সুবিধা নিশ্চিত করা। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মূল্য বৃদ্ধিতে সরকারি প্রকল্প ভূমিকা রাখছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, রাজধানীর আশপাশে অপরিকল্পিত আবাসন বিস্তারের কারণে কৃষিজমি ও জলাধার দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ভারসাম্য, জলাবদ্ধতা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের মতে, উন্নয়ন প্রয়োজন হলেও তা হতে হবে পরিকল্পিত ও জনবান্ধব। পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে নগরায়ণ হলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়বে সমাজ।
এলাকাবাসীর দাবি, তারা উন্নয়নের বিরোধী নন। তবে উন্নয়নের নামে কৃষিজমি, জলাশয় ও স্থানীয় মানুষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রাজউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জমি বা প্লট কেনার আগে ক্রেতাদের প্রকল্পের বৈধ অনুমোদন যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালির পরিচালকদের দাবি, সব সরকারি নিয়ম ও অনুমোদন মেনেই প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, ভবিষ্যতে এটি একটি আধুনিক আবাসিক এলাকায় পরিণত হবে।
এলজিইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারিগরি বিষয়, মাটির অবস্থা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনা করেই সেতুর বর্তমান স্থান নির্বাচন করা হয়েছে।
তবে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে—জনস্বার্থে নির্মিত সরকারি সেতু কি প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাবে, নাকি এর মাধ্যমে একটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্প অতিরিক্ত সুবিধা পাবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর নজরদারি।






