ভুক্তভোগী নারী দাবি—দীর্ঘ পাঁচ বছরের অবৈধ সম্পর্ক, জোরপূর্বক গর্ভপাত, আর্থিক প্রতারণা ও মানসিক নির্যাতন; অভিযুক্ত ডাক্তার বদলির চেষ্টা শুরু করেছেন; আইন বিশেষজ্ঞরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ উল্লেখ করেছেন
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার ডা. মাঈদুল ইসলাম মুকুল এর বিরুদ্ধে এক নারীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সম্পর্ক, ব্ল্যাকমেইল, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী লুবনা আক্তার আলো, যিনি বর্তমানে মিরপুর লালকুঠির একটি মাতৃসদন হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত, গণমাধ্যমকে তার পাঁচ বছরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
ডা. মুকুল কুড়িগ্রামের কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং মরহুম মোঃ আবেদ আলী এর ছোট ছেলে। তিনি ২০১৯ সালে উলিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন, পরে ভারপ্রাপ্ত আরএমও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজে যোগ দিয়ে BMDC প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। তার BMDC রেজিস্ট্রেশন নাম্বার A-79952।

তিনি ৩৯ তম বিসিএস কেডারের চিকিৎসক। ২০২৫ সালে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার হিসেবে যোগ দেন এবং বর্তমানে সেখানে কর্মরত রয়েছেন।
ভুক্তভোগী লুবনা আক্তার অভিযোগ করেছেন, ২০২১ সালে উলিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত অবস্থায় তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে তিনি সম্পর্ক থেকে সরে আসতে চাইলে মুকুল তার মোবাইলে থাকা ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল শুরু করেন এবং সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই সম্পর্কের মধ্যে তিনি দুইবার গর্ভবতী হলে ডা. মুকুল তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করাতে বাধ্য করেন। মুকুল প্রভাব খাটিয়ে তাকে ঢাকায় বদলি করেন এবং মিরপুর লালকুঠির মাতৃসদনে কর্মরত অবস্থায় তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল সংলগ্ন গণভবন স্টাফ কোয়ার্টারের ১৬ নম্বর বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গিয়ে একাধিকবার রাতযাপন করান। দীর্ঘ সময় ধরে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে পরে এড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, মুকুল সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নগদ অর্থ, ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করেছেন।
দীর্ঘ মানসিক চাপের কারণে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ লুবনা আক্তার তার নিজ ঘরে একটি সুইসাইড নোট লিখে মুকুলের বাসায় অবস্থান নেন।


পরদিন ১৬ মার্চ তার বাড়িওয়ালা মোঃ নাসির দারুস সালাম থানায় ঘটনাটি অবহিত করলে পুলিশ ও ভুক্তভোগীর আত্মীয়-স্বজন যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। দারুস সালাম থানার এসআই ধীরাজ নন্দী জানান, যদিও ঘটনাস্থান তাদের থানা এলাকা নয়, নারী ঘটনা হওয়ায় মানবিক দিক বিবেচনা করে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ ও ভুক্তভোগীর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে গিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয় এবং মেয়েটিকে তার গার্ডিয়ানের হাতে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, মুকুলের খালাতো ভাই ডাব্লু সাহেব, ঢাকার ওয়াসা জোন ৬-এ কর্মরত, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পারিবারিকভাবে ঈদের পর বিয়ের আশ্বাস দেন বলে দাবি করেন লুবনা। তবে ডাব্লু সাহেব গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি কোনো প্রকার বিয়ের আশ্বাস দেননি, তিনি শুধু ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তার বাবার অসুস্থতার কারণে সাময়িক স্থগিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
উলিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও নার্সরা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানিয়েছেন, মুকুলের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পরবর্তীতে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো তার জন্য নতুন কিছু নয়। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, মুকুল শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফিমেল মেডিকেল স্টুডেন্টদের পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের লোভ দেখিয়ে তার রুমে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর মোবাইলে মুকুল হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় লিখেছেন, “সাংবাদিক ও পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করছি, প্রয়োজনে আরও খরচ করব, তারপরও তোমাকে বিয়ে না করে বদনাম করব।”
উক্ত ঘটনার পরপরই জানা গেছে, অভিযুক্ত ডা. মাঈদুল ইসলাম মুকুল শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে বদলি নেয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন, যাতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও চলমান পরিস্থিতি থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়।

দৈনিক আমাদের সমাচার অনলাইন মাল্টিমিডিয়া হাউজ থেকে অভিযুক্ত ডা. মুকুলের সঙ্গে একাধিকবার সরাসরি ও মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে এটি বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর একাধিক ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর মধ্যে রয়েছে: প্রতারণা (ধারা ৪২০), বিশ্বাসভঙ্গ (ধারা ৪০৬), ফৌজদারি ভয়ভীতি প্রদর্শন (ধারা ৫০৬) এবং নারীর সম্মতি ছাড়া গর্ভপাত ঘটানো (ধারা ৩১৩)। সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কঠোর শাস্তি আরোপ করা যেতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, এটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক নারীর উপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক নির্যাতনের ঘটনা। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বানও করেছেন।
ঘটনাটি চিকিৎসা পেশার নৈতিকতা এবং নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন তুলেছে।
এখন দেখার বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
উক্ত বিষয়ে
ভিডিও নিউজ দেখতে চোখ রাখুন
দৈনিক আমাদের সমাচার
মাল্টিমিডিয়ায়






