তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট নকল করে ভুয়া চিকিৎসা সেবা দেখিয়ে রোগীদের বিদেশে পাঠিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে Rapid Action Battalion–এর Rapid Action Battalion‑4। অভিযানে তাদের কাছ থেকে প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামতও জব্দ করা হয়েছে।
র্যাব জানায়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাহিনীটি সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি সংঘবদ্ধ প্রতারণাসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ দমনে কাজ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি একটি ভয়ংকর প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়, যারা বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছিল।
র্যাব-৪ সূত্রে জানা যায়, তুরস্কভিত্তিক চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান টার্কিশডক–এর আদলে হুবহু একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে “টার্কিশ ডক বিডি” নামে নিজেদের পরিচয় দিতো চক্রটি। তারা দাবি করত যে তারা তুরস্কের বিভিন্ন হাসপাতালের বাংলাদেশি প্রতিনিধি এবং সেখানে কিডনি প্রতিস্থাপনসহ নানা জটিল চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। এই প্রলোভনে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হতো।
সম্প্রতি নিরব নজরুল লিখন নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তার মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য এই চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হন। অভিযোগের ভিত্তিতে Dhaka Metropolitan Police–এর Shyampur Police Station–এ একটি মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার সূত্র ধরে র্যাব-৪ অভিযান চালিয়ে চক্রের মূলহোতাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— নুরুজ্জামান রাজু (৩৬) দিনাজপুর, মাসুম বিল্লাহ (৪৩) বরগুনা, মোহাম্মদ তরিকুল (৩০) দিনাজপুর, সালমান ফারসি (৩৫) দিনাজপুর এবং ওয়ালিদ মিয়া (২৬) টাঙ্গাইলের বাসিন্দা।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী তার মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের চিকিৎসার জন্য এক দালালের মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চক্রের সদস্যরা নিজেদের তুরস্কের একটি হাসপাতালের এজেন্ট পরিচয় দিয়ে প্রায় ২৩ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের কথায় বিশ্বাস করে ভুক্তভোগী দেশে প্রথমে নগদ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করেন এবং বিভিন্ন কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণের জন্য আরও প্রায় দুই লাখ টাকা দেন।
পরবর্তীতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ভুক্তভোগী ও তার মা তুরস্কে গেলে সেখানে চক্রের সহযোগীরা তাদের রিসিভ করে একটি হাসপাতালে ভর্তি করায়। ভর্তি হওয়ার পর বিভিন্ন অজুহাতে নির্ধারিত টাকার বাইরে আরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। কিডনি ডায়ালাইসিস, নথি অনুবাদসহ নানা খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে মোট প্রায় অর্ধকোটি টাকার বেশি নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু এত অর্থ নেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা না করিয়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে রোগীকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়। এমনকি পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
র্যাবের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের তুরস্কে পাঠাতো। সেখানে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো। এমনকি এই প্রতারণার শিকার হয়ে কয়েকজন বাংলাদেশি বিদেশে আইনি জটিলতায়ও পড়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অসুস্থ মানুষ ও তাদের পরিবারের দুর্বলতাকে পুঁজি করে প্রতারণা করা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অমানবিক অপরাধ। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করার পাশাপাশি যাচাই-বাছাই করা জরুরি। একই সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা রোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও জোরদার করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রতারণা চক্রের অন্য সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।






