ক্ষমতা বদলায়, সরকার বদলায়—কিন্তু চরিত্র বদলায় না। সাভারের রাজনীতিতে সেই পুরনো সত্যটাই আবারও সামনে আসছে সোহরাব হোসেনকে ঘিরে। বছরের পর বছর চাঁদাবাজি, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচিত এই বিতর্কিত চরিত্র আজ নতুন রাজনৈতিক লেবাসে আবারও সক্রিয়—আর তাতেই আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বৈরাচারী সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশ্রয়ে গড়ে ওঠা অপরাধের যে নেটওয়ার্ক সাভারে দীর্ঘদিন দাপট দেখিয়েছে, তার অন্যতম মুখ ছিলেন সোহরাব হোসেন। সরকার পতনের পর দৃশ্যপট বদলালেও অপরাধের অভিযোগ কিংবা প্রভাব খাটানোর কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসেনি—শুধু বদলেছে রাজনৈতিক পরিচয়।
আওয়ামী ছত্রচ্ছায়ায় উত্থান, বিএনপির লেবাসে পুনরাবির্ভাব সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়নে ‘সোহরাব হোসেন’ নামটি এখন আতঙ্কের প্রতিশব্দ।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি করে আসছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনকে কার্যত উপেক্ষা করে একটি পরিবহন কোম্পানি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে নিজেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।
স্বৈরাচার সরকারের সময়ে কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আলোচিত ভূমিদস্যু সাইফুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন সোহরাব হোসেন। এলাকাবাসীর ভাষায়, সে সময় তিনি ছিলেন সাইফুল আলম খানের কার্যত ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’। ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন এই সক্রিয় এই চাদাঁবাজ।
সরকার পতনের পর ‘লেবাস বদল’করে চতুর সোহরাব ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর থেকেই শুরু হয় নতুন নাটক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিক তখন থেকেই সোহরাব হোসেনকে বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সক্রিয়ভাবে দেখা যেতে থাকে। শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে ‘বিএনপির লোক’ হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন তিনি।
কিন্তু অভিযোগ এখানেই থেমে নেই। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকাশ্যে বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করলেও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গোপনে আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছেন সোহরাব হোসেন।

ফলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—রাজনীতি কি আদর্শের জায়গা, নাকি কেবল ক্ষমতার সঙ্গে টিকে থাকার সুবিধাবাদী কৌশল?
ব্যক্তিগত জীবনেও অভিযোগের পাহাড় রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সোহরাব হোসেনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোহরাবের ঘনিষ্ঠ জন ও স্থানীয়দের দাবি, একাধিক বিবাহ ও বিভিন্ন নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, পাঁচ স্ত্রী থাকা অবস্থায় সম্প্রতি বরিশালের এক নারীকে ষষ্ঠ বিয়ে করার পর প্রথম স্ত্রী আমেনা বেগমের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন তিনি। আমেনা বেগম অভিযোগ করেন, “আপনি আমার কোটি টাকার বাড়ি বিক্রি করেছেন, আমার ও ছেলের নামে থাকা গাড়ি বিক্রি করেছেন—এখন আবার টাকা চান। আমি কোথা থেকে টাকা দেব?”
এই কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে সোহরাব হোসেন তার ওপর ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, নিজের সন্তান আদনানকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানোর অভিযোগও এলাকায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র হত্যা মামলা নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলা, রয়েছে তবুও অদৃশ্য সুরক্ষায় প্রকাশ্যভাবে প্রশাসনের সম্মুখে ঘোরাফেরা করছে অভিযুক্ত সোহরাব হোসেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘আবু সালেহ’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিসহ আমেনা বেগম ও তার আরও দুই স্ত্রী সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও যৌতুক সংক্রান্ত একাধিক মামলা দায়ের করেছেন। অভিযোগের পাহাড় জমলেও অজ্ঞাত কোনো শক্তির প্রভাবে এসব মামলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই—এমনটাই দাবি এলাকাবাসীর। শুধু তাই নয় আধিপত্য নিয়ে মসজিদ কমিটিতেও বিতর্কিত এই সোহরাব
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এতসব অভিযোগের পরও সোহরাব হোসেন মাইনকাটেক এলাকার একটি মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি পদে বহাল রয়েছেন। স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, স্বৈরাচার সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই পদ দখল করেছিলেন তিনি, যা এখন নতুন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়াতেও অটুট। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও যদি অভিযোগে জর্জরিত ব্যক্তির এমন প্রভাব বজায় থাকে, তবে সমাজের নৈতিকতার জায়গা কোথায়—এ প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে সোহরাব হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “আমি এখন ব্যস্ত আছি, পরে সরাসরি বসে কথা বলবো।” প্রশাসনের প্রতি প্রশ্ন এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সোহরাব হোসেন কীভাবে প্রকাশ্যে প্রভাব খাটাচ্ছেন? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা কি ক্ষমতার নতুন লেবাসের ফল?
বিএনপির প্রতি এলাকাবাসীর প্রশ্ন অভিযোগে জর্জরিত একজন সুবিধাবাদী চরিত্র কি দলের আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে?
যাচাই-বাছাই ছাড়াই কারা দলে আশ্রয় পাচ্ছে?
সোহরাব হোসেনকে ঘিরে ওঠা চাঁদাবাজি, সহিংসতা, নারী নির্যাতন ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অভিযোগ কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়—এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন একটাই— সুবিধাবাদীদের প্রশ্রয় দিলে আদর্শের রাজনীতি টিকবে কতদিন? আর সাধারণ মানুষের আস্থা ভাঙবে আর কতবার?






