রাজধানী

বিজয় সরণির নিচে ক্ষুধার ঘুম: স্বাধীনতার গৌরব আর রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মুখোমুখি বাংলাদেশ

যুদ্ধবিমানের ছায়ায় না খেয়ে ঘুমানো পথশিশু প্রশ্ন তোলে—নির্বাচনের আগে আমরা কি সত্যিকারের স্বাধীনতার হিসাব মিলাতে পারব?

স্বাধীনতার সংজ্ঞা কেবল পতাকা, স্মৃতিসৌধ কিংবা বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, যখন তার নাগরিককে ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় না, যখন কোনো শিশুকে খোলা আকাশের নিচে না খেয়ে ঘুমাতে হয় না। অথচ রাজধানীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা বিজয় সরণি প্রতিদিন যেন এই সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ঢাকা মহানগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর একটি বিজয় সরণি। নামের মধ্যেই বহন করে ১৯৭১ সালের বিজয়, রক্তঝরা ইতিহাস আর আত্মত্যাগের গৌরব। এই সড়ক শুধু ইট-পাথরের পথ নয়—এটি স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মার এক দৃশ্যমান রূপ। তেজগাঁও এলাকার মাঝখান দিয়ে বিস্তৃত এই সড়কের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন—বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মিগ-২১ যুদ্ধবিমান। একসময়ের শত্রু ঘাঁটি তেজগাঁও বিমানবন্দরকে ছাপিয়ে আজ সেটি প্রতিরোধ, সাহস আর স্বাধীনতার প্রতীক।
কিন্তু এই গর্বের প্রতীকের ঠিক নিচেই প্রতিদিন ফুটে ওঠে এক নির্মম বাস্তবতা। যুদ্ধবিমানের ছায়ায়, ঘাসের ওপর ক্লান্ত শরীর মেলে ঘুমিয়ে পড়ে এক ক্ষুধার্ত পথশিশু। আকাশমুখী বিজয়ের স্মারক আর মাটিতে পড়ে থাকা অনাহারের শরীর—এই বিপরীত দৃশ্য যেন রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নীরব ভাষ্য।
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই সড়ক পার হয়। কারও হাতে অফিস ব্যাগ, কারও চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কারও মাথায় জীবনের হিসাব। কিন্তু খুব কম মানুষই থামে সেই শিশুটির পাশে। বিজয়ের সড়ক তখন রূপ নেয় উপেক্ষার মহাসড়কে। স্মৃতির গৌরব আর বাস্তবতার লজ্জা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে—আমরা কী ধরনের স্বাধীনতা উদযাপন করছি?
এই দেশ একদিনে স্বাধীন হয়নি। লক্ষ প্রাণের রক্তে লেখা হয়েছে এই ভূখণ্ডের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে যেমন মানুষ অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি ২০২৪ সালেও ন্যায়, অধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল লাখো মানুষ। তবু প্রশ্ন রয়েই যায়—এত ত্যাগের পরও কেন আজ একজন শিশুকে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমোতে হয় বিজয়ের স্মারকের নিচে?
এমন এক সময়ে দেশ যাচ্ছে আরেকটি নির্বাচনের দিকে। চূড়ান্ত হয়েছে প্রার্থী তালিকা, জমে উঠছে ভোটের হিসাব। কিন্তু এই নির্বাচন কি কেবল ক্ষমতার অঙ্ক, নাকি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ? ভোটের বাক্স থেকে কি এমন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে, যারা পথশিশু, ক্ষুধা ও বৈষম্যকে ইতিহাসে পরিণত করবে?
সচেতন নাগরিকদের কণ্ঠে একটাই দাবি—আর নয় ভুল নির্বাচন। মোহক ভাষণ, ফাঁকা প্রতিশ্রুতি কিংবা ক্ষমতার লোভে ব্যর্থ নেতৃত্বকে আর সুযোগ দেওয়া যাবে না। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই না, যেখানে প্রতিটি মোড়ে ফুল বিক্রি করা শিশুর চোখে লুকিয়ে থাকবে ক্ষুধা, আর ধনীদের নিরাপত্তায় রাষ্ট্র নির্বিকার থাকবে। আমরা চাই না এমন শাসন, যেখানে সন্ত্রাস বাড়বে, রক্তপাত হবে, আর সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাবে।
আজ বিজয় সরণি কেবল অতীতের গৌরব বহন করছে না—এটি আমাদের অপূর্ণ স্বাধীনতার জীবন্ত দলিল। এই সড়ক প্রতিদিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—কবে আসবে সেই বাংলাদেশ, যেখানে স্বাধীনতা শুধু স্মৃতিস্তম্ভে নয়, মানুষের ভাত-কাপড়-নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হবে?
যুদ্ধবিমানটি এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আর তার নিচে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। এবার সেই যুদ্ধের ময়দান ভোটকেন্দ্র। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এবার সত্যিই স্বাধীনতার অসম্পূর্ণ হিসাব পূরণ করতে পারব?

Leave a Reply