রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর থানাধীন আরামবাগের ৭ নম্বর সড়কে রাজ্জব কমিশনারের বাড়ির বিপরীতে অবস্থিত ‘নামার ঝিলে’ বাবুর মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন মো. আক্তার মিয়া। তাঁকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা অভিযান চালাচ্ছেন। এদিকে প্রিয়জনের সন্ধান না পেয়ে শোকে দিশেহারা হয়ে পড়েছে তাঁর পরিবার। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পর পরিবারকে খবর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাবুর স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে।
নিখোঁজ আক্তার মিয়া কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার আগানগর গ্রামের আলগা বাড়ির বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম মো. মুছা মিয়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাবুর মোবাইল ফোন ঝিলের পানিতে পড়ে গেলে সেটি উদ্ধারের জন্য বাবুর স্ত্রী স্বপ্না ১ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার চুক্তিতে আক্তার মিয়াকে ডেকে আনেন। এরপর মোবাইল ফোন উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ঝিলে নামেন আক্তার মিয়া। একপর্যায়ে তিনি পানিতে নিখোঁজ হন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, আক্তার মিয়া নিখোঁজ হওয়ার আনুমানিক আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পর তাঁদের বিষয়টি জানানো হয়। কেন এত দেরিতে পরিবারকে খবর দেওয়া হলো, তা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাবুর স্ত্রী স্বপ্না গণমাধ্যমকে বলেন, মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য আক্তার মিয়ার সঙ্গে ১ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। তাঁকে ঝিলের পানির বেশি গভীরে না যেতে বলা হয়েছিল। তারপরও তিনি গভীরে চলে যান বলে দাবি করেন স্বপ্না। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাঁর মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে গিয়েই আক্তার মিয়া নিখোঁজ হয়েছেন।
অন্যদিকে স্বপ্নার মা বলেন, “আমরা ইচ্ছা করে কাউকে মারিনি। উনি ওনার টাকার প্রয়োজনে এসেছিলেন, আর উঠতে পারেননি। এখানে আমাদের দোষ কোন জায়গায়?”
এদিকে নিখোঁজ আক্তার মিয়াকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা নিরলসভাবে কাজ করছেন। উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক সরাসরি ও পরোক্ষভাবে নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তিনি কিছুক্ষণ পরপরই উদ্ধার তৎপরতার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন এবং অভিযান পরিচালনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
একটি অসহায় পরিবারের স্বজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া ও উদ্ধার কার্যক্রমের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রশংসনীয় হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, তাঁর তদারকিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং দ্রুত আক্তার মিয়ার সন্ধান পাওয়া যাবে।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজ আক্তার মিয়াকে উদ্ধারে আগের দিনও অভিযান চালানো হয়। তবে সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে আসায় উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখতে হয়। পরদিন দুপুর ১টা থেকে আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।
উদ্ধারকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝিলের প্রায় ২০ ফুট এলাকার বাঁশ-খুঁটি ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে জায়গা পরিষ্কার করার প্রয়োজন ছিল, যাতে ডুবুরিরা নির্বিঘ্নে তল্লাশি চালাতে পারেন। আগের দিন প্রায় ৫ ফুট এলাকার প্রতিবন্ধকতা সরানো হয়েছিল। বাকি অংশের বাঁশ-খুঁটি সরিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, এ ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসীর একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, ঢাকা-১৬ আসনের স্থানীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল বাতেন এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আক্তার মিয়ার অসহায় পরিবারের খোঁজখবর নেননি। এমনকি উদ্ধার অভিযান কতদূর এগিয়েছে, সে বিষয়েও তাঁর পক্ষ থেকে খোঁজ নেওয়ার কোনো উদ্যোগ তাঁদের চোখে পড়েনি বলে দাবি স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর বক্তব্য, একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবার যখন চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির উচিত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো এবং উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া। তাঁদের প্রত্যাশা, স্থানীয় সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াবেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্থানীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল বাতেনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে আক্তার মিয়ার পরিবারের সদস্যরা এখনো তাঁর সন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছেন। পরিবারের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক আকুতি জানিয়েছেন তাঁর মেয়ে। বাবাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা মেয়েটি এখন অন্তত তাঁর বাবার মরদেহ উদ্ধারের আবেদন জানাচ্ছেন।
আক্তার মিয়ার মেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার বাবাকে তো আর জীবিত উদ্ধার করতে পারবে না। অন্তত বাবার লাশটুকু আমাদের উদ্ধার করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন। আমরা বাবার লাশটা চাই, শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে চাই।”
মেয়ের এই আকুতি পরিবারের অসহনীয় কষ্টের চিত্র তুলে ধরেছে। প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারটির দাবি, দ্রুত উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করে আক্তার মিয়ার মরদেহ তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
এলাকাবাসীর বক্তব্য, ঝিলের ভেতরে থাকা বাঁশ-খুঁটি ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দ্রুত সরিয়ে উদ্ধার অভিযান আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, উদ্ধারকর্মীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মানবিক দায়িত্ব।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে তাঁকে উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং তাঁর পরিবারের মানবিক সংকট বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। উদ্ধার অভিযানে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব যেন না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত উদ্ধারকাজের অগ্রগতি জানানো, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া মানবিক দায়িত্ব। ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
আক্তার মিয়ার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একদিকে উদ্ধার অভিযানের অপেক্ষা, অন্যদিকে প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি—সব মিলিয়ে পরিবারটির সময় কাটছে গভীর শোক ও উৎকণ্ঠায়। প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং উদ্ধার তৎপরতার বিষয়ে নজর রাখার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দ্রুত আক্তার মিয়ার সন্ধান পাওয়া যাবে এবং অসহায় পরিবারটি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাবে।






