রাজধানী

ক্ষমতার অপব্যবহারে প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক বলয়: পাওনা অর্থ আদায়ে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ 

রাজধানীর মিরপুরের গুদারাঘাটের বাসিন্দা মরহুম হাসানের মৃত্যুর প্রায় আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার কবীর আহম্মদের কাছে পাওনা ২৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা আদায় করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। ছেলের মৃত্যুর পর থেকে প্রাপ্য অর্থ আদায়ের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহলের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অসহায় মা। পরিবারের অভিযোগ, পাওনা অর্থ আদায়ের উদ্যোগে কবীর আহম্মদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বাধা সৃষ্টি করছেন বাংলা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত গোলাম রব্বানী।

পরিবারের দাবি, গত ৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মরহুম হাসানের পাওনা ২৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকার বিষয়ে নতুন করে লিখিত ডিড সম্পাদন এবং সমপরিমাণ অর্থের একটি চেক দেওয়ার কথা ছিল। বৈঠকে মরহুম হাসানের মা, খালা, খালাতো ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, কবীর আহম্মদের পক্ষেও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি পরিবারের।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, কবীর আহম্মদের উপস্থিতিতে বৈঠকে গোলাম রব্বানী প্রকাশ্যে বলেন, “কবীরের টাকা দেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু কবীর টাকা দেবে না। আপনাদের ক্ষমতা থাকলে আপনারা কবীরের কাছ থেকে টাকা আদায় করে নেন। আর এখান থেকে যাওয়ার পর যদি এই টাকার বিষয় নিয়ে অন্য কোথাও কারও সঙ্গে বসেন, তাহলে আপনাদের বিরুদ্ধে আমাদের যা ব্যবস্থা নেওয়ার, আমরা তা নেব।”

পরিবারের দাবি, এ ধরনের বক্তব্যের কারণে পাওনা অর্থ আদায়ের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে গোলাম রব্বানীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রকাশ করা হবে।

ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাওনা অর্থ পরিশোধের বিষয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কবীর আহম্মদের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। এ সময় দুই পক্ষের সমঝোতার অংশ হিসেবে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ২৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকার নতুন ডিড সম্পাদন এবং সমপরিমাণ অর্থের চেক দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, এ-সংক্রান্ত চুক্তিপত্রে চেকের নম্বর ও অ্যাকাউন্টের বিবরণ উল্লেখ করার জন্য কবীর আহম্মদের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে চেক ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি পাঠানো হয়েছিল।

পরিবারের প্রশ্ন, কবীর আহম্মদ যদি পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে না চান, তাহলে নতুন করে লিখিত ডিড সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হলো কেন? চুক্তিপত্রে উল্লেখের জন্য চেকের নম্বর ও অ্যাকাউন্টের তথ্যসহ ছবি পাঠানো হলো কেন? একইভাবে, পাওনা অর্থের পরিমাণ কমিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অর্থের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কেন?
মরহুম হাসানের পরিবারের দাবি, ব্যবসায়িক লেনদেনের হিসাব অনুযায়ী তাঁদের মোট পাওনা ছিল ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে কবীর আহম্মদ বিভিন্ন দেনাদারকে ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন বলে জানিয়েছে পরিবার। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে অবশিষ্ট পাওনার পরিমাণ ২৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

পরিবারের দাবি, এ অর্থের বিষয়ে তাঁদের কাছে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তিপত্র রয়েছে। এ ছাড়া কবীর আহম্মদ, মরহুম হাসানের আরেক ব্যবসায়িক অংশীদার মোহাম্মদ রুবেল এবং দক্ষিণবিশিলের ৭ নম্বর রোডের স্থানীয় বাড়িওয়ালা হাজী মোহাম্মদ মজিবর মিয়াসহ একাধিক ব্যক্তি এ লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট আলোচনার বিষয়ে জানেন বলে তাঁদের দাবি।

চুক্তিপত্রে কবীর আহম্মদের কাছে পাওনা অর্থ পরিশোধের শর্ত ও সংশ্লিষ্ট হিসাব উল্লেখ রয়েছে বলেও জানিয়েছে পরিবার। তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও লেনদেনের হিসাব যাচাই করলেই পাওনা অর্থের বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

মরহুম হাসানের মা অভিযোগ করে বলেন, ছেলেকে হারানোর পর তাঁর পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। ছেলের রেখে যাওয়া পাওনা অর্থ আদায় করে পরিবারের ঋণ পরিশোধ ও জীবিকা নির্বাহ করতে চান তিনি।

পরিবারের দাবি, মরহুম হাসান ছিলেন তাঁদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ এই অর্থের সঙ্গে জড়িত। ছেলের মৃত্যুর পর পরিবারটি একদিকে যেমন স্বজন হারানোর শোক বহন করছে, অন্যদিকে তেমনি আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দিন কাটাচ্ছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মরহুম হাসানের মা বলেন, “আমার একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে আল্লাহতালা দুনিয়া থেকে নিয়ে গেছেন। এখন তার প্রাপ্য পাওনাটুকু আদায় করতে গিয়েও যদি রাজনৈতিক নেতারা বাধা দেন, তাহলে আমি কার কাছে যাব? আমার ছেলের পাওনা টাকা দিয়ে পরিবারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে, পরিবার চালাতে হবে। আমি আমার ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না, অন্তত তার প্রাপ্য অর্থটুকু যেন পাই।”

পাওনা অর্থ নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, লেনদেনের হিসাব, চেক এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ৩৭ ধারায় চুক্তির পক্ষগুলোর প্রতিশ্রুতি পালনের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ধারার প্রয়োগ নির্ভর করবে চুক্তির প্রকৃতি, শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আইনগত অবস্থানের ওপর।
অন্যদিকে, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। কেবল পাওনা অর্থ পরিশোধ না করা বা সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়ার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো ফৌজদারি অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হয় না।

পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। তাঁদের দাবি, লিখিত ডিড, চেকের তথ্য, পূর্বে পরিশোধিত অর্থের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা হোক।

পাশাপাশি, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে পাওনা অর্থ আদায়ে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে পরিবার।

মরহুম হাসানের পরিবারের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র, লেনদেনের হিসাব ও সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে তাঁদের পাওনা অর্থের বিষয়ে দ্রুত আইনানুগ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সন্তানহারা এই মায়ের দাবি, তিনি কারও অনুগ্রহ চান না; তিনি চান তাঁর ছেলের প্রাপ্য অর্থ এবং পরিবারের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক।

Leave a Reply