অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার আড়াই বছর পর রহস্য উদঘাটন
ঢাকার নবাবগঞ্জে অটোরিকশাচালক মো. রাহুল (১৯) হত্যা ও অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার আড়াই বছর পর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরা পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ, পিপিএম।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—নবাবগঞ্জের পাতিলঝাপ এলাকার মো. সমেজ (৩২), একই এলাকার মো. সবুজ মিয়া (২৮), সিংহড়া এলাকার খবির ওরফে গোবিন্দ (২৮), মো. হাবিব ওরফে সজল (৩৬) এবং মো. লালন মোল্লা (৪৩)। তাদের মধ্যে সবুজ মিয়া ও লালন মোল্লা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পিবিআই জানায়, নিহত রাহুল নবাবগঞ্জের চক সিংহড়া এলাকার একটি ওয়ার্কশপে অটোরিকশা রাখতেন এবং সেখানেই রাতে ঘুমাতেন। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বাসা থেকে খাবার খেয়ে অটোরিকশা নিয়ে ওয়ার্কশপে যান তিনি। পরদিন সকালে রাহুলকে ওয়ার্কশপে পাওয়া যায়নি। বন্ধ পাওয়া যায় তার মুঠোফোনও। একই সঙ্গে নিখোঁজ ছিল তার ভাড়ায় চালিত অটোরিকশাটি।

দুই দিন পর ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে ওয়ার্কশপের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে একটি জমির আইলের ঝোপ থেকে রাহুলের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা মো. আবদুর রহমান বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআই ঢাকা জেলার কাছে হস্তান্তর করা হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১, ৩৪ ও ৩৯৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
তদন্তে নেমে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে মো. সমেজকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় মো. সবুজ মিয়াকে। পরে সবুজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খবির ওরফে গোবিন্দ, মো. হাবিব ওরফে সজল এবং মো. লালন মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানা যায়, রাহুলের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। লালন মোল্লা ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাহুলসহ অন্যরা তার কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন এবং একসঙ্গে সেবন করতেন।
তদন্তে উঠে আসে, লালনের ইয়াবা ব্যবসার তথ্য রাহুল বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ করে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে রাহুলকে হত্যা করে তার অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১০টার দিকে লালনের নির্দেশে সবুজ রাহুলকে অটোরিকশাসহ একটি খোলা মাঠে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই লালন, সজল, সমেজ ও গোবিন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পিবিআই জানায়, সেখানে প্রথমে রাহুলকে ইয়াবা সেবন করানো হয়। একপর্যায়ে লালন লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে রাহুলের মাথার পেছনে আঘাত করেন। এতে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। পরে ব্লেড দিয়ে কান ও মুখে আঘাত করা হয় এবং অটোরিকশার ব্যাটারি দিয়েও তাকে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে শ্বাসরোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
৯
হত্যার পর রাহুলের মরদেহ অটোরিকশায় তুলে সজলের গরুর খামারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মরদেহটি দুই দিন রাখা হয়। পরে ৯ ফেব্রুয়ারি রাতের দিকে মরদেহটি ওয়ার্কশপের পাশে একটি ঝোপে ফেলে রেখে যায় হত্যায় জড়িতরা। পরদিন সকালে সেখান থেকেই রাহুলের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে, হত্যার পর রাহুলের অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেয় আসামিরা। বিক্রি থেকে পাওয়া টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ, পিপিএম বলেন, মামলাটির তদন্তভার পাওয়ার পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। দীর্ঘ আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে নিরলস তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
পিবিআই জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।






